
ডায়বেটিস একটি জীবনধারণের রোগ, যা সাধারণত রক্তে শর্করার পরিমাণ অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ঘটে। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি করতে পারে এবং বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। তবে, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত জীবনযাপন ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই এর প্রতিকারে প্রথমেই আমি ডায়বেটিসের বিভিন্ন ধরন, তার প্রভাব এবং খাদ্যের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করব।
ডায়বেটিস কি?
ডায়বেটিস মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে:১.টাইপ ১ ডায়বেটিস: এটি একটি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের ইমিউন সিস্টেম ইনসুলিন তৈরির জন্য দায়ী অঙ্গ, অর্থাৎ প্যানক্রিয়াসকে আক্রমণ করে। ফলে ইনসুলিন উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় এবং রক্তে শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এই ধরনের ডায়বেটিস সাধারণত ছোটবেলা বা কৈশোরে শুরু হয়। ২. টাইপ ২ ডায়বেটিস: এটি ইনসুলিন প্রতিরোধ (insulin resistance) এর কারণে ঘটে। অর্থাৎ, প্যানক্রিয়াস যথেষ্ট পরিমাণে ইনসুলিন তৈরি করতে পারে, কিন্তু শরীরের কোষগুলি ইনসুলিনের প্রতিক্রিয়া দেখাতে অক্ষম। এটি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায় এবং প্রধানত জীবনযাত্রার অভ্যাসের কারণে হয়ে থাকে।
ডায়বেটিসের প্রভাব :
ডায়বেটিসের কারণে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে কিডনি সমস্যা, চোখের রোগ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, স্নায়ুজনিত সমস্যা এবং পায়ের ক্ষত অন্যতম। যেহেতু ডায়বেটিস শরীরে ইনসুলিনের ঘাটতি বা প্রতিরোধের কারণে ঘটে, সেহেতু রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ রাখা অত্যন্ত জরুরি।
খাদ্যের ভূমিকা :
ডায়বেটিসের প্রতিকার এবং নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে ডায়বেটিসের কষ্ট অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
১. শর্করা নিয়ন্ত্রণ:
ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে শর্করার পরিমাণ কমানো অত্যন্ত জরুরি। সাদা রুটি, সাদা চাল, কেক, পেস্ট্রি, সফট ড্রিংকস ইত্যাদি খাবারে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকে, যা রক্তে শর্করার স্তর দ্রুত বৃদ্ধি করে। এ ধরনের খাবারগুলো পরিহার করা উচিত এবং তাদের পরিবর্তে কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) সম্পন্ন খাবার, যেমন: ব্রাউন রাইস, ওটস, শসা, পালং শাক, লাল শাক ইত্যাদি গ্রহণ করা উচিত। এই ধরনের খাবারগুলো ধীরে ধীরে রক্তে শর্করা মুক্ত করে, যার ফলে শর্করার স্তর দ্রুত বাড়ে না।
২. প্রোটিনের গুরুত্ব:
ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি শর্করা শোষণের হার কমিয়ে দেয় এবং রক্তে শর্করার পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ায়। মাছ, মাংস, ডাল, দুধ, টোফু ইত্যাদি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারগুলো ডায়বেটিস রোগীদের জন্য উপকারী। তবে, অতিরিক্ত তেলযুক্ত বা মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এসব খাবার গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
৩. ফ্যাটের প্রকারভেদ:
ফ্যাটও ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে, তবে সঠিক প্রকারের ফ্যাট খাওয়া জরুরি। অতিরিক্ত পরিমাণে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা ট্রান্স ফ্যাট খাওয়া ডায়বেটিসের পরিস্থিতি আরো খারাপ করতে পারে। অপর দিকে, অলিভ অয়েল, আখরোট, বাদাম, ফ্ল্যাক্স সিড, চিয়া সিড ইত্যাদি নির্ভেজাল স্নিগ্ধ ফ্যাট ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
৪. সেবনীয় আঁশের উপকারিতা:
বিভিন্ন ধরণের শাকসবজি, ফলমূল, স্যালাড, ফুলকপি, ব্রকলি, গাজর, বীট, শিম, ডাল ইত্যাদিতে প্রচুর আঁশ (fiber) থাকে, যা হজমের জন্য ভালো এবং রক্তে শর্করার স্তর নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। আঁশ শরীর থেকে শর্করা শোষণকে ধীর করে এবং হজম প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। ফলস্বরূপ, রক্তে শর্করা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পায় না।
৫. পানির গুরুত্ব:
পানি শরীরের সঠিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে পানির ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করলে রক্তের শর্করার স্তরকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য হয়, বিশেষত টাইপ ২ ডায়বেটিসে। এটি শরীর থেকে অতিরিক্ত গ্লুকোজ দূর করতে সহায়ক।
৬. খাবারের পরিমাণ ও সময়:
খাবারের পরিমাণ এবং সময়ও ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। একবারে বেশি খাবার খাওয়ার পরিবর্তে ছোট ছোট খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। এতে ইনসুলিনের নিঃসরণ সঠিকভাবে কাজ করে এবং রক্তে শর্করার পরিমাণ স্থির থাকে। নিয়মিত সময় মেনে খাবার খাওয়া এবং অনিয়মিত খাবারের অভ্যাস পরিহার করা উচিত।
উপসংহার:
ডায়বেটিস একটি নিরাময়যোগ্য রোগ নয়, তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিয়ে এ রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। খাদ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সঠিক খাদ্য নির্বাচন ডায়বেটিসের প্রভাব কমাতে এবং শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং ভালো জীবনযাপন ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মাহমুদা নাজনীন
ক্লিনিক্যাল ডাইটেশিয়ান কনসালটেন্ট & ওবেসিটি স্পেশালিষ্ট,
সেন্ট্রাল হাস্পাতাল ধানমন্ডি, ঢাকা