
জুলাই বিপ্লব এবং কিছু কথা
মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থান এসেছে মানুষের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও সমতার চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা থেকে। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই মাসটি এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এ মাসেই বাংলাদেশের মানুষ দ্বিতীয়বারের মতো তাদের অধিকার, মর্যাদা এবং স্বাধীনভাবে বাঁচার স্বপ্ন পুনরুদ্ধারে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলো।
দীর্ঘ ১৫ বছরের দমননীতি, গুম, খুন, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে দেশের আপামর জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিলো । রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাথমিক আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে জুলাই মাসে তা রূপ নেয় ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে এক সর্বজনীন গণঅভ্যুত্থানে। শেষপর্যন্ত পতন ঘটে ফ্যাসিস্ট সরকারের, আর সেই ইতিহাসে রক্তের অক্ষরে লেখা হয় হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ। বহু মানুষ তাদের হাত-পা, দৃষ্টি কিংবা জীবনযাপনের সক্ষমতা হারিয়ে আজও বয়ে বেড়াচ্ছে সেই বিপ্লবের ক্ষতচিহ্ন।
জুলাই বিপ্লবের কোনো একক নায়ক বা মাস্টারমাইন্ড ছিলো না—এটি ছিল জনগণের সার্বজনীন আন্দোলন। সাধারণ মানুষ এই বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিলো। এমন এক বাংলাদেশের প্রত্যাশা করেছিল, যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করবে, জনগণের সেবা করবে এবং তাদের কাছে জবাবদিহি থাকবে।
মানুষ চেয়েছিলো পুরোনো, দুর্নীতিগ্রস্ত ও দমনমূলক রাজনীতির পরিবর্তে এক নতুন ব্যবস্থা—যেখানে প্রতিষ্ঠিত হবে জনগণের সরকার, থাকবে না রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, প্রশাসনে থাকবে স্বচ্ছতা, সততা ও জবাবদিহিতা। তারা আশা করেছিলো এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার, যেখানে ঘুষ, দুর্নীতি, হত্যা, গুম-খুনের মতো অপসংস্কৃতি চিরতরে বিলুপ্ত হবে, আর রাষ্ট্র একবিংশ শতাব্দীর চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে যাবে।
এই নতুন ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হবে তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের শক্তি। অস্থির বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করবে—দক্ষিণ এশিয়ায় এক উদীয়মান শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। উন্নত পররাষ্ট্রনীতি, ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক গতিশীলতার মাধ্যমে দেশ এগিয়ে যাবে টেকসই উন্নয়নের পথে।
তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে গড়ে উঠবে একটি মানবিক, সাম্যভিত্তিক ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ—যে বাংলাদেশ হবে সত্যিকার অর্থে “নতুন বাংলাদেশ”।.
জুলাই বিপ্লবের এক বছর পরে এসে মনে হচ্ছে ব্যর্থ হচ্ছে বিপ্লব। বিপ্লবের স্পিরিট একটুও নেই। পুরানো সবকিছু চলমান রয়েছে নতুন রূপে । শুধুমাত্র হাত এবং ব্যক্তি বদল হয়েছে । বিপ্লব পরবর্তী সরকার কাঙ্খিত কাজ করতে পারেনি। রাজনৈতিক দলগুলো এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্টেক হোল্ডাররা বিপ্লবের স্পিরিট ধারণ করেনি । তারা পুরাতনকেই আঁকড়ে ধরে আছে। তাহলে কি এ বিপ্লব ব্যর্থ হয়ে গেল? ব্যর্থ হতে চলেছে। চলুন এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি। জুলাই বিপ্লব ব্যর্থ বা ব্যর্থ হতে চলেছে তা জানার আগে বিপ্লব কেন ব্যর্থ হয় এ নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক ।
প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের অভাব বিপ্লব ব্যর্থতার অন্যতম মূল কারণ। রাজনৈতিক দার্শনিক হান্না আরেন্ট (Hannah Arendt) বলেছেন— “সবচেয়ে উগ্র বিপ্লবীও বিপ্লবের পরের দিনই রক্ষণশীল হয়ে ওঠে।” অর্থাৎ, বিপ্লবের পর যদি পুরনো প্রশাসনিক ও ক্ষমতার কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে, তবে নতুন শাসকরাই ধীরে ধীরে পুরনো দমননীতির অংশে পরিণত হয়।
দ্বিতীয়ত, নেতৃত্ব ও জনগণের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বিপ্লবের প্রাণশক্তিকে দুর্বল করে দেয়। সমাজমনোবিজ্ঞানী ফ্রান্ত্জ ফ্যানন (Frantz Fanon) এবং শিক্ষাচিন্তাবিদ পাওলো ফ্রেইরে (Paulo Freire) উল্লেখ করেছেন যে, বিপ্লব ব্যর্থ হয় যখন নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দূরে সরে যায় এবং নতুন ক্ষমতাবান শ্রেণি পুরনো শোষণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর অটুটতা বিপ্লবের ফল সীমিত করে। কার্ল মার্ক্স (Karl Marx) লিখেছিলেন— “মানুষ নিজের ইতিহাস তৈরি করে, কিন্তু নিজের ইচ্ছামতো নয়।” অর্থাৎ, সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি যদি অপরিবর্তিত থাকে, তবে রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল উপরের স্তরে প্রভাব ফেলে, নিচের জনগণের জীবনে নয়।
চতুর্থত, আদর্শিক বিভাজন ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রায়ই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ঐক্যের ভাঙন ঘটায়। ক্ষমতার ভাগাভাগি, ব্যক্তিস্বার্থ, ও মতবিরোধ আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্যকে ক্ষীণ করে দেয়। ফলে যে ঐক্য একসময় পরিবর্তনের চালিকাশক্তি ছিল, সেটিই পরে দুর্বলতার কারণ হয়।
উপরোক্ত বিষয়গুলো সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে কেন বিপ্লব ব্যর্থ হয় এ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। বিষয়গুলোকে যদি আপনি বাংলাদেশের বিপ্লব পরবর্তী সময়ের সাথে মূল্যায়ন করেন তাহলে দেখবেন অধিকাংশ গুলো বাংলাদেশের সাথে মিলে যাচ্ছে। এবার চলুন সমসাময়িক পেক্ষাপটে আরো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করি কেনো বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব /অভ্যুত্থান ব্যর্থ হতে চলেছে বা হয়েছে ।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন, দুর্বলতা ও উপদেষ্টা পরিষদের বিতর্ক
ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর আগস্ট মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন বিশ্ববরেণ্য নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউনূস, যিনি জাতির কাছে দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছতা, মানবিকতা ও সামাজিক উদ্যোক্তা চেতনার প্রতীক ছিলেন। দল–মত নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের জনগণ তাঁর নেতৃত্বে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও প্রশাসনিক সংস্কারের এক নতুন যুগের প্রত্যাশায় বিভোর হয়ে ওঠে। মানুষ বিশ্বাস করেছিল—ড. ইউনূসের হাত ধরেই শুরু হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন এবং জন্ম নেবে “নতুন বাংলাদেশ”।
ড. ইউনূস সেই প্রত্যাশার প্রেক্ষিতে একদল উপদেষ্টা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেন। উপদেষ্টা পরিষদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাব ছিল স্পষ্ট; অনেক সদস্যই দলীয় সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন, যার ফলে জুলাই বিপ্লবের মূল স্পিরিট ও আদর্শ ব্যাহত হয়েছে। তাছাড়া অনেকেই একসময় এনজিও, উন্নয়ন সংস্থা বা একাডেমিক খাতে সক্রিয় ছিলেন। বর্তমানে এই উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সংখ্যা ৩৬ জন। তবে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই নানারকম বিতর্ক ও গুঞ্জন ছিল। অভিযোগ রয়েছে—ড. ইউনূস অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত পছন্দের মানুষদের নিয়োগ দিয়েছেন, যার ফলে প্রশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞতার ঘাটতি থেকে গেছে। অনেক উপদেষ্টা এনজিও সংশ্লিষ্ট, আবার অনেকেই রাষ্ট্রীয় প্রশাসন বা রাজনৈতিক বাস্তবতায় অভিজ্ঞ নন।
বয়সজনিত কারণে বহু উপদেষ্টাই প্রয়োজনীয় সক্রিয়তা দেখাতে পারছেন না, আবার কিছু উপদেষ্টা নিজেদের দফতরে তুলনামূলক সফল হলেও সামগ্রিকভাবে পরিষদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকট। অনেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, আত্মীয়প্রীতি, সুবিধাভোগী আচরণ, এমনকি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে, কিন্তু ড. ইউনূস দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। এর ফলে জনমনে হতাশা বাড়ছে।
অন্যদিকে ছাত্র উপদেষ্টাদের প্রতি তাঁর বিশেষ দুর্বলতা, নীতিনিষ্ঠা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অভিযোগ রয়েছে—উপদেষ্টা পরিষদের একাংশ নিজ নিজ মতাদর্শ বা রাজনৈতিক প্রভাব অনুযায়ী কাজ করছে, যা একটি নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকারের মূল চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক উপদেষ্টা জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট রক্ষার পরিবর্তে নিজেদের অবস্থান ও সুবিধা সুরক্ষায় বেশি মনোযোগী। যে প্রেক্ষাপটে এই সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সেটি ভুলে তারা গতানুগতিক প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ধারা অনুসরণ করছে। ফলে নতুন রাষ্ট্র কাঠামো গঠনের প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
ছাত্র উপদেষ্টাদের ভূমিকা ও তারুণ্যের বিপর্যয়
জুলাই বিপ্লবে ছাত্রসমাজের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সাহস ও আত্মত্যাগই ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল। দেশবাসী বিশ্বাস করেছিল—এই তরুণরাই একদিন নতুন বাংলাদেশ গড়বে, তারা হবে পরিবর্তনের নেতৃত্বদাতা। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে যখন ছাত্রনেতারা অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দেন, তখন জাতির প্রত্যাশা আরও বেড়ে যায়।
কিন্তু সময়ের ব্যবধানে দেখা গেলো, সেই স্বপ্ন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ছাত্রদের উপদেষ্টা পরিষদে যোগদান অনেকটাই হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি করেছে। এমনকি সরকারে থেকে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে ছাত্রনেতারা—যা জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনা ও নিরপেক্ষ প্রশাসনিক ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অল্প বয়সে ক্ষমতার লোভ সামলাতে পারেনি সরকারে থাকা ছাত্র প্রতিনিধি এবং আন্দোলন সংশ্লিষ্ট শীর্ষ নেতৃত্ব। ঘুষ, চাঁদাবাজি ইত্যাদির সাথে জড়িত। যার দরুণ তাদের ইমেজ পুরোপুরি ক্ষুন্ন হয়েছে। সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে এ-হেন অন্যায় কাজ নেই যে তারা করেনি। যেটা জুলাই স্পিরিটের পরিপন্থি।ইতিমধ্যেই অনেকেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে
তাদের কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট হয়েছে, তারা গতানুগতিক রাজনৈতিক দলের মতো ক্ষমতালোভী আচরণ করছে। জনগণের মধ্যে যারা একসময় জুলাইয়ের স্পিরিট জাগিয়েছিল, তারাই আজ সেই চেতনা বিক্রি করে ব্যক্তিস্বার্থে লিপ্ত। গুঞ্জন রয়েছে, তারা সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট “কিংস পার্টি” হিসেবে সুবিধা নিচ্ছে—যা তাদের স্বাধীন চরিত্র ও জনগণকেন্দ্রিক ভাবমূর্তিকে পুরোপুরি ধ্বংস করেছে।
এখন প্রশ্ন হলো—যারা একসময় ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারা রাজনৈতিক দল হিসেবে কতটা সফল হবে? ইতিহাস বলে, আদর্শ হারিয়ে যারা ক্ষমতার মোহে পড়ে, তারা জনগণের আস্থা ফিরে পায় না। জুলাই বিপ্লবের ছাত্রনেতারা সেই পরীক্ষায় আপাতত ব্যর্থ। তারা জুলাই আদর্শের ধারক নয়, বরং তার অবমাননাকারী হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অসহযোগিতা ও পুরনো সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ
জুলাই বিপ্লবের অন্যতম লক্ষ্য ছিল—রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে এক নতুন গণতান্ত্রিক বন্দোবস্ত তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সেই আদর্শ বাস্তবায়নে সহযোগিতা না করে উল্টো বাধা সৃষ্টি করেছে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ও দমননীতির শিকার হয়েছিল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য বিরোধী দল। সাধারণ মানুষ ভেবেছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে এই দলগুলো নতুনভাবে রাজনীতি শুরু করবে, নীতিনিষ্ঠ ও গণমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলবে।
কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। বিএনপি, জামায়াত ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল পুরনো ধারা বজায় রেখেছে—অর্থাৎ ক্ষমতায় ফেরা, প্রভাব বিস্তার, এবং প্রশাসনে প্রভাব খাটানো। অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর তারা ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে নিজেদের দলীয় স্বার্থ রক্ষায়। প্রশাসনের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক সুপারিশ, এবং ক্ষমতালাভের উদ্দেশ্যে দ্রুত নির্বাচনের দাবি—সবই পুরনো রাজনীতির পুনরাবৃত্তি।
সরকার যে রাষ্ট্রীয় সংস্কার কমিশন, প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও গণভোটের মতো মৌলিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যমত কমিশনেও কোনো কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। বরং “পি আর”, “জুলাই ডিক্লারেশন”, “গণভোট” ইত্যাদি ইস্যুতে তারা নিজেদের দলীয় অবস্থানেই অটল থেকেছে।
এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে আঁতাতসহ নানাবিধ অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। তারা নিজেদের স্বার্থে জনগণকে ব্যবহার করছে, বিপ্লবের চেতনা নয়। এমনকি কিছু দল বিদেশি শক্তির প্রভাবেও কাজ করছে—যা জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য উদ্বেগজনক।
ফলে বলা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর অসহযোগিতা, হীনমন্যতা ও অনগ্রহই জুলাই বিপ্লবের স্পিরিটকে ক্ষুণ্ন করেছে। তারা “নতুন” কে স্বাগত জানাতে না পেরে “পুরনো” কে চাপিয়ে দিচ্ছে জাতির ওপর। জনগণ চায় পরিবর্তন, কিন্তু রাজনীতিকেরা চায় পুনরুদ্ধার—এই দ্বন্দ্বই আজকের বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক সংকট।
প্রশাসনের দলীয়করণ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা
এটা আজ আর কারও অজানা নয় যে, ফ্যাসিস্ট শাসনের দীর্ঘ ১৫ বছরের সময়ে বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো গভীরভাবে দলীয়করণের শিকার হয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে, সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত, আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট লোকদের প্রভাব ও দাপট ছিল সর্বত্র। যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার পরিবর্তে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্য ছিল প্রধান মানদণ্ড। ফলে প্রশাসন হয়ে উঠেছিল এক ধরনের “দলীয় যন্ত্র”, যা জনগণের সেবার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থরক্ষায় বেশি মনোযোগী ছিল।
জুলাই বিপ্লবের পর প্রশাসন কাঠামোতে কিছু পরিবর্তন আনা হলেও, বহু দলীয় অনুগত কর্মকর্তা এখনো বিভিন্ন স্তরে ঘাপটি মেরে আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদও একাধিকবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এই প্রশাসনিক পক্ষপাত, অব্যবস্থা ও অসহযোগিতার বিষয়ে। প্রশাসনের অভ্যন্তরে থাকা এই প্রো-দলীয় ধারা বিপ্লব-পরবর্তী পুনর্গঠনে বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছে। সচিবালয় ও বিভিন্ন সরকারি দফতরে বারবার দেখা গেছে প্রণোদনার অভাব, নীতিনিষ্ঠার সংকট ও নিষ্ক্রিয় মনোভাব।
এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে যেমন পুলিশ, র্যাব, এমনকি কিছু সামরিক সদস্যের পক্ষপাতিত্ব ও নিষ্ক্রিয়তাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের দায়িত্বহীনতা, ভীতু মনোভাব ও কখনো কখনো নীরব সহযোগিতা—সবই জুলাই বিপ্লবের সফল বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদেশি হস্তক্ষেপ ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের জটিলতা
জুলাই বিপ্লবের আদর্শ ও চেতনা যাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে, তার জন্য নানাভাবে কাজ করেছে বিভিন্ন বিদেশি শক্তি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; ফলে এখানে স্থিতিশীলতা বা অস্থিতিশীলতা—দু’টিই বিদেশি স্বার্থের অংশ হয়ে উঠেছে।
বিগত সময়ে দেখা গেছে, কিছু আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চেয়েছে। কেউ কেউ চাইছে বাংলাদেশ হোক তাদের প্রভাব বলয়ের একটি “বাফার জোন” । বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্র অতীতে ফ্যাসিস্ট শাসনকে সরাসরি সমর্থন জানিয়েছিল, এবং এখনো তাদের কার্যক্রমে প্রতীয়মান হয় যে তারা পুনরায় সেই শক্তিকে পুনর্বাসিত করতে চায়।
অন্যদিকে, পশ্চিমা শক্তিগুলোর একাংশও চায় না যে বাংলাদেশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হয়ে উঠুক। তারা নানা অজুহাতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে, আন্তর্জাতিক সংলাপ ও সহায়তার মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করেছে, এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনর্গঠনের পথে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। তাই বলা যায়—বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংকট যেমন ছিল বাস্তব, তেমনি বহিরাগত শক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবও ছিল বিপ্লবের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়: বিপ্লব ব্যর্থতার আরেক বাস্তব কারণ
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ও জুলাই বিপ্লবের ব্যর্থতার একটি বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, নৈতিকতার অবক্ষয়, এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব আমাদের সমাজকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছে। মানুষ মতাদর্শের চেয়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর প্রতি বেশি অনুগত হয়ে পড়েছে। প্রধান দুটি রাজনৈতিক ধারার বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের মধ্যেও দেখা গেছে গভীর বিভাজন। কেউ দলীয় মতাদর্শ প্রচারে ব্যস্ত, কেউ ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের হিসাব মেলাতে ব্যস্ত। ফলে বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে জনগণের ঐক্য ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন পেশাজীবী, কর্মচারী, ও সংগঠন নিজেদের দাবি আদায়ে রাস্তায় নেমেছে, যা বিপ্লব-পরবর্তী সংবেদনশীল সময়ে কাম্য ছিল না। এতে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ে, আর জনগণের আস্থা দুর্বল হয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, নৈতিক অবক্ষয়ের চরম প্রকাশ ঘটেছে ৫ আগস্টের ঘটনাবলিতে—যখন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট হয়েছে। মানুষ নিজেকে হারিয়েছে, মানবিকতা হারিয়েছে। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি বেড়েছে, আর সমাজে ভয়, হতাশা ও অরাজকতার বাতাস বইছে। এই সবই প্রমাণ করে, রাজনৈতিক চেতনা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের অভাব আমাদের সমাজে কতটা গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে।
শেষ কথা: নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা
ইতিমধ্যে সরকার ঘোষণা করেছে যে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—নতুন সরকার কি সত্যিই জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও আদর্শ ধারণ করবে? তারা কি জনগণকেন্দ্রিক, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে কাজ করবে?
অন্তর্বর্তী সরকার কি তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে, নাকি তারাও ধীরে ধীরে পুরনো ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি করছে—তা সময়ই বলে দেবে।
তবুও আশার আলো আছে। অনেক হতাশার মধ্যেও এই প্রত্যাশা রাখি—নতুন বাংলাদেশ যেন জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট, আত্মত্যাগ ও মানবিক চেতনা ধারণ করে এগিয়ে যায়। তাহলেই শান্তি পাবে আবু সাঈদ, আনাস, ওয়াসিম, মুগ্ধসহ হাজারো শহীদের আত্মা; তাহলেই সত্যিকারের “নতুন বাংলাদেশ” গঠনের স্বপ্ন বাস্তব রূপ পাবে।
এ.এম. হেলাল
রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রফেশনাল
mansur.mrf.bd@gmail.com