দুপুর ২:৪৬ সোমবার ২৭শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই অভ্যুত্থান এবং নতুন বাংলাদেশ : আবুল মনসুর হেলাল

জুলাই অভ্যুত্থান এবং নতুন বাংলাদেশ

শুরুতেই জুলাই আন্দোলনে শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং আহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি । দেখতে দেখতে ১ বছর পূর্ণ হয়ে গেলো জুলাই আন্দোলনের। যে আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে নতুন প্রভাতের , যেখানে সবার ঊর্ধ্বে দেশ এবং দেশের জনগণ। যে নেশায় বিভোর হয়ে প্রাণ দিয়েছিলো আবু সাঈদ ,ওয়াসিম, আনাস, ফারহান, মুগ্ধসহ নাম জানা-অজানা আরও অনেকে। হাজারো তাজা প্রাণ এবং হাজারো আহতদের আর্তনাদের ফসল আজকের এই বাংলাদেশ। এ এ আন্দোলন ছিলো এক ফ্যাসিস্ট রেজিমের বিরুদ্ধে বঞ্চিত মানুষের বজ্রধ্বনি প্রতিবাদ। যে শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে অকার্যকর হয়ে পড়েছিল যেখানে মৌলিক অধিকার বা নাগরিক অধিকার বলতে কিছুই ছিল না। কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা জনগণকে জিম্মি করে রেখেছিলো। বিরোধী মত দমনে বর্বর যুগের হিংস্রতাকে ও হার মানিয়ে ছিলো ফ্যাসিস্ট রেজিম ।
আমরা ফ্যাসিস্ট রেজিমে দেখেছি কিভাবে ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছিলো । ক্ষমতার মোহ এবং লেজুরবৃত্তির করাল গ্রাসে মোহাচ্ছন্ন ছিলো পুরো দেশ।এক দিকে কর্তৃত্ববাদী শাসন, দর্নীতি,গুম,খুন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, অন্যদিকে হাজারো নির্যাতন সয়ে বাঁচার নব প্রত্যাশার এক সম্মিলিত প্রচেষ্টা হলো জুলাই বিপ্লব বা অভ্যুত্থান। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এ অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়ছিলো দীর্ঘদিন ধরে। এজন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে এটা সবারই জানা। রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন পূর্ণতা পায় ছাত্রদের নেতৃত্বে সংঘটিত হওয়া জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে। এই বিপ্লবে মানুষ নিজ তাগিদে অংশগ্রহণ করেছিলো। মা সন্তানকে আন্দোলনে পাঠিয়েছে, স্ত্রী স্বামীকে উৎসাহ জুগিয়েছে আন্দোলনে, আর বোন তার ভাইয়ের সাথে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলো। এ আন্দোলন ছিলো সার্বজনীন । এতে বিভিন্ন মত ও পেশার মানুষ নিজ উদ্যোগে অংশগ্রহণ করেছিলো। আর নেতৃত্ব দিয়েছিল ছাত্ররা। পেছনে ছিলো সকল বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এবং সাধারণ জনতা। এই আন্দোলনে দুটি পক্ষ ছিলো। (১) ফ্যাসিস্ট রেজিম এবং (২) মুক্তিকামী জনতা । এই আন্দোলনে একক কারো ও কৃতিত্ব নেই, নেই কোন মাস্টারমাইন্ড। তবে নেতৃত্বে ছাত্ররা ছিলো। আর তাদের আন্দোলনে পেছনে থেকে সর্ব শক্তি দিয়ে পাশে ছিলো প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সহ অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি। মনে করুন জুলাই অভ্যুত্থান যদি সফল না হতো তাহলে আজকে কি অবস্থা হতো আন্দোলন সংশ্লিষ্টদের। ভাবা যায় ফ্যাসিস্ট রেজিম কতটা হিংস্র এবং ভয়ানক হতো?

যেমনটা বলেছিলাম জুলাই বিপ্লবে বাংলাদেশ নতুন করে বাঁচতে শিখেছে। এখন প্রশ্ন হলো জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট কি ধরে রাখতে পারবে সংশ্লিষ্ট পক্ষ গুলো? জুলাই স্পিরিট ধরে রাখার মূল দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর। বিদ্যমান বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো যদি দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ না হয় তাহলে এ বিপ্লব পুরোপুরি ব্যর্থ হবে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের আলাদা আলাদা মতাদর্শ আছে, আর তারা এইসব মতাদর্শ বাস্তবায়নে কাজ করে। প্রশ্ন হলো, বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ বাদ দিয়ে দেশ জাতির বৃহত্তর স্বার্থে জুলাই আন্দোলনের স্পিরিটকে মূল্যায়ন করবে? আর যদি তারা মূল্যায়ন না করে তাহলে জুলাই আন্দোলন পুরোপুরি ব্যর্থ হবে। ব্যর্থ হবে হাজারো প্রাণ বিসর্জনের। রাজনৈতিক দলগুলো যদি ফ্যাসিস্ট রেজিম থেকে শিক্ষা না নেয় এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চালু না করে এটা দেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর হবে। আমি আশা রাখি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব জনগণের প্রত্যাশাকে মূল্য দিয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। যেখানে থাকবে জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট।

জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিটকে কাজে লাগিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দূঢ় প্রত্যয়ে আমাদের সবাইকে কাজ করতে হবে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের দেশ পরিচালনায় এগিয়ে আসতে হবে। নতুন বাংলাদেশ পরিচালনার দায়িত্ব যে রাজনৈতিক দলের উপর‌ই আসুকনা কেনো তাদেরকে নতুন ম্যান্ডেট ঘোষণা করতে হবে দেশ ও জাতির জন্য। যেখানে জন আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে চলমান পৃথিবীর সাথে এগিয়ে চলা যায় এমন সব পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের জন সম্পদের যথোপযুক্ত ব্যবহার করতে হবে। নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ধর্মীয় চেতনাকে মাথায় রেখে নতুন বাংলাদেশ করার প্রত্যয়ে বাস্তব এবং বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে, সামাজিক, ন্যায় বিচার এবং সুশাসনকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক ও ভূ-রাজনীতিকে মাথায় রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। অস্বীকার করার উপায় নেই দেশের অর্থনীতি ভালো যাচ্ছে না। একটা সুন্দর এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর‌ই কাম্য। বিশ্ব বরেণ্য নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক সম্পর্কের উন্নতি করার এখনই উপযুক্ত সময়। তবে নির্বাচনের আগে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। ইতিমধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনী তারিখ ঘোষণা করেছেন। ঘোষিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট রোড ম্যাপ আর তা অন্তর্বর্তী সরকারকেই করতে হবে। বেশিদিন অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকা গণতন্ত্রের জন্য সুখবর নয়। তাছাড়া দেশ-বিদেশি ষড়যন্ত্র তো বাংলাদেশকে ঘিরে আছেই। আধিপত্যবাদ বিশ্বে বাংলাদেশ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট দেশ সমূহ নিজেদের কূটকৌশল নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। এমতাবস্থায় সরকারের উচিত হবে রাজনৈতিক দল ও সব পক্ষকে ধারন্নিয়ে ঐক্যের পথে দৃঢ় থাকা। যাতে কোন ষড়যন্ত্রই কাজে না আসে।
ফ্যাসিস্ট রেজিম কোন এক দেশের ধারা প্রভাবিত ছিলো । অন্তর্বর্তী সরকারকে এরকম কোন পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না যাতে করে তারা কোন দেশ বা শক্তির হয়ে কাজ করে। অন্তর্বর্তী সরকারকে থাকতে হবে সকল বিতর্কের উর্ধ্বে। তাদের শাসনকাল যেন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য উদাহরণ হয়ে থাকে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বহুল চর্চিত বিষয় হলো মৌলিক সংস্কার। আর এই সংস্কার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। বিদেশীদের প্রেসক্রিপশনে না গিয়ে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যেসব বিষয় প্রযোজ্য সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েই সংস্কার করতে হবে।

পরিশেষে আবারো জুলাই আন্দোলনে নিহত সকল শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং আহতদের দ্রুত রোগ মুক্তি কামনা করছি মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট। আবু সাঈদ এর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশ হোক সবার এবং বৈষম্যহীন। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে থাকুক আর এটাই হোক জুলাই অভ্যুত্থানের মূল মন্ত্র।

আবুল মনসুর হেলাল
রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট প্রফেশনাল
Email: mansur.mrf.bd@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *