বিকাল ৩:৪৩ সোমবার ২৭শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজনীতির সাতকাহন : জুলাই বিপ্লব / অভ্যুত্থান এবং আজকের বাংলাদেশ : এ.এম. হেলাল

রাজনীতির সাতকাহনঃ জুলাই বিপ্লব / অভ্যুত্থান এবং আজকের বাংলাদেশ

বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ। তিনদিক দিয়ে ভারত ঘেরা এবং একদিকে বঙ্গোপসাগর। অনেক প্রতিকূলতার মাঝেও যেনো হাজারো সম্ভাবনার হাতছানি। এশিয়া তথা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে জনবহুল দেশটির মানুষ বলা চলে অনেকটাই আবেগপ্রবণ এবং পরিশ্রমীও বটে। অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে যাচাইনা করে যেনো স্রোতের অনুকূলে গা ভাসানো এখানকার মানুষদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার প্রবাহিত অজস্র জলরাশি এদের মাটিকে যেমন করেছে উর্বর, শস্য-শ্যামল, তেমনি এ দেশের মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছেন অনেক জ্ঞানী গুনী মানুষ। যারা নিজ নিজ কর্ম মহিমায় স্বদেশ এবং বিদেশের মানুষদের কাছে গ্রহনযোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। বিধাতার সুনিপুণ সৃষ্টি যেনো বাংলাদেশ নামক ছোট্ট দেশটি।

 

এই দেশের জন্মটা কিন্তু সহজে হয়নি। ১৯৪৭ এর দেশ ভাগের পর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে পাকিস্তানের অংশ হয় এবং নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকদের পক্ষপাতিত্ব শাসনের ফলে বাংলাদেশ সব কিছুতেই পিছিয়ে পড়ে। বঞ্চিত হওয়ার জায়গা থেকেই শুরু হয় স্বাধিকার তথা স্বাধীনতার আন্দোলন। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন এর মাধ্যমে শুরু এবং শেষ হয় ৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ৫২ থেকে ৭১ মাঝখানে অনেক কিছুই ঘটেছে। সেগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করলাম না। লাখো শহীদের প্রাণের বিনিময় এবং অসংখ্য মা- বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয় বহুল আকাংখিত স্বাধীনতা। ১৬ ডিসেম্বর বাংলার আকাশে উদিত হয় নতুন সূর্যের। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পূর্ণতা পায় একটি লাল সবুজ পতাকার। বিশ্বে বাঙালিরা পরিচিতি পায় বীরের জাতি হিসেবে যারা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে।

লেখার শুরুর দিকে বলেছিলাম বাংলাদেশের মানুষ আবেগপ্রবণ, এরা অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে কোনো কিছু বিচার করেনা। আমি একজন রিসার্চ এবং ডেভেলআপমেন্ট প্রফেশনাল হিসেবে সারাদেশ ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয়েছে। কথা বলার সুযোগ হয়েছে এলিট ক্লাস, পেশাজীবি থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের সাথে। বাংলাদেশের মানুষ আবেগপ্রবণ এটা আমার একান্তই ব্যক্তি মতামত। এবার মূল বিষয় শুরু করা যাক।

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের মানুষ কি পেয়েছে তাদের কাংখিত দেশ/ অধিকার? যে স্বপ্নে বিভোর হয়ে একাত্তরের রণাঙ্গনে অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। পায়নি তাদের কাংখিত বাংলাদেশ। বরং স্বাধীনতা বা বিজয় পরবর্তী শাসকগোষ্ঠি রাজনীতির বয়ান দিয়ে নিজেদের আখের ঘুচিয়েছে। এই আবেগপ্রবণ মানুষদের আবেগ নিয়ে কেউ কাজ করেনি। এ জাতি কাংখিত নেতৃত্ব পায়নি কখনো। মিথ্যার ফুলঝুরি দিয়ে আবেগী জাতিকে বার বার প্রতারিত করা হয়েছে এবং এখনো করছে। ৭১ পরবর্তী শাসন ব্যবস্থায় আমরা দেখেছি সীমাহীন দূর্নীতি, লুটপাট, বাক-স্বাধীনতা হরণ, গণতন্ত্র হত্যাসহ বহু কালা কানুন। যার ফলশ্রুতিতে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে। শাসকদল বরাবরই সুবিধা নিয়েছে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। আম-জনতার স্বপ্নকে কখনোই প্রাধান্য দেয়নি। রাজনৈতিক দল বা শাসক গোষ্ঠী যদি জনগণের হয়ে কাজ করতো তাহলে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে অন্যরকম হতেও পারতো।GDP, HDI, Per Capita ইত্যাদি উন্নয়ন সূচকে অনেক এগিয়ে থাকতো।

একটা দেশ বা জাতি একবারেই স্বাধীনতা অর্জন করে। বার বার দাসত্বের শিকলে আবদ্ধ হয়না।

গত ১৫ বছর বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেছে এক কালো শাসন- ব্যবস্থার। একটা ফ্যাসিস্ট রেজিম কিভাবে একটা দেশকে শেষ করতে পারে তার সবকিছুই হয়েছে বিগত বছরগুলোতে। সীমাহীন দূর্নীতি, লুটপাট, বিরোধীদের দমন, গুম, খুন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড একব্যক্তি/ একদলীয় শাসন, দলীয়করণ, পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠাসহ কতকিছু না প্রত্যক্ষ করেছে বাংলাদেশের জনগণ। ভোটাধিকার হরণ, রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে, উন্নয়নের নামে হরিলুট হয়েছে। এক উন্নয়ন দর্শন দিয়েই ফ্যাসিস্ট রেজিম আবেগ-প্রবণ জাতির আবেগ নিয়ে খেলা করেছে।
প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে উন্নয়নের বিকল্প নেই। কিন্তু আমাদের দেশে গত দেড় দশকে যতো উন্নয়ন হয়েছে তা যদি স্বচ্চতা ও জবাবদিহিতার মধ্যে সম্পন্ন হতো তাহলে যা খরচ হয়েছে তার ৩ ভাগের একভাগ দিয়ে সম্পন্ন হতো। একটা রাজনৈতিক দল শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য রাষ্ট্রের সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করে বিতর্কিত করেছে। আয়না ঘরের দূর্বিষহ যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে কতজনের তা বলে শেষ করা যাবেনা। মানবাধিকার বলতে কিছু ছিলোনা। বিএনপিসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে সীমাহীন যন্ত্রনার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। ফ্যাসিস্ট রেজিম একটা জেনারেশনকে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিলো।

প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বিগত ১৫ বছর এই ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছিলো। এরকম হাজারো সমস্যার আবর্তে যখন বাংলাদেশ হঠাৎ করেই ছাত্রদের কিছু দাবি নিয়ে শুরু হয় আন্দোলন। ছাত্রদের দাবি- দাওয়া পূরনের আন্দোলন থেকেউ শুরু হয় ফ্যাসিস্ট রেজিমের পতনের আন্দোলন। মূলত ছাত্ররা এর ইনিশিয়েটর হলেও পেছনে ছিলো বিএনপি সহ রাজনৈতিক দলগুলোর অকন্ঠ সমর্থন এবং অংশগ্রহণ। ফ্যাসিস্ট রেজিমের বিরুদ্ধে জেগে উঠলো বাংলার আপামর জনতা। নতুন স্বাধীনতার লড়াইয়ে যুক্ত হলো সর্বস্তরের জনগণ। ফ্যাসিস্ট সরকার কেড়ে নিলো আবু সাইদ, ওয়াসিম, আনাস, মুগ্ধসহ নানা পেশার হাজারো মানুষের প্রাণ। আহত হয় অসংখ্য মানুষ, এক পর্যায়ে জনতার প্রবল প্রতিরোধে দেশ ত্যাগে বাধ্য হয় ফ্যাসিস্ট সরকার। পতন হয় এক অপশাসন যুগের। বাঙালিরাই মনে হয় ২ বার জীবন দিয়েছে নতুন স্বাধীনতার জন্য। ২য় স্বাধীনতা, অভ্যুত্থান বা বিপ্লব যেটাই বলিনা কেনো সেটা ২০২৪ এর জুলাইয়ে সংগঠিত হয়েছিলো। এই বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশের আবেগী জনগণ চেয়েছিলো ফ্যাসিস্ট রেজিমের বিচার, সংস্কার এবং নির্বাচন। প্রশ্ন হলো আদৌ কি ইন্টেরিম গভর্ণমেন্ট এবং রাজনৈতিক দলগুলো এ লক্ষ্যে হাটছে? না-কি তারাও আবেগ নিয়ে খেলা করছে পূর্বসূরীদের ন্যায়। যেখানে ২য় সূর্যোদয়ের একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বে প্রমাণ করার সুযোগ এসেছে – সেটাকে কাজে না লাগিয়ে গতানুগতিক ধারায় চলছে সবকিছু।

বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকান্ডে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ। বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো চেইন অব কমান্ড ঠিক রাখতে পারছেনা । তাদের কর্মী সমর্থকরা নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। আবার কিছু কিছু রাজনৈতিক দলের মোটিভ নিয়েও সন্দেহ বাড়ছে। আদৌও তারা কি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছে বা করবে নাকি পূর্বসূরীদের অনুসরণ করবে।

জুলাই বিপ্লবের দাবিবার একক কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়। এর একক কোনো মাস্টার মাইন্ড নেই। এ বিপ্লব ছিলো বাংলার সাধারণ মানুষের। একাত্তর দেখিনি, ২৪ দেখেছি এ যুদ্ধে শরীক হয়েছিলো শিশু-নারী- বয়োবৃদ্ধ থেকে শুরু করে সব পেশার মানুষ। অস্বীকার করার উপায় নেই বিগত ফ্যাসিস্ট রেজিমে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয়েছে জিয়া পরিবার, বিএনপি এবং জামায়াত। বিএনপি বিগত ১৫ বছর ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছিলো এবং তা জুলাই বিপ্লবে পূর্নতা পায়।

বলছিলাম রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকান্ডে সাধারণ মানুষ বিরক্ত এবং তারা ফ্যাসিস্ট রেজিমের কার্যক্রম দেখতে পাচ্ছে। জুলাই বিপ্লবের দাবিবার ছাত্রদের রাজনৈতিক দল এনসিপির কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের নেতারা বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। সন্দেহ বাড়ছে এনসিপি সরকারের কিংস পার্টি কি না । সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ছাত্র উপদেষ্টাদের স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

তাছাড়া ইন্টেরিম গভর্ণমেন্টের কিছু কাজে জনগণের সন্দেহ বাড়ছে। আদৌ কি তারা বিচার, সংস্কার এবং নির্বাচন করবে? করলেও এই গুলোর রোড ম্যাপ কি? কিছু কিছু উপদেষ্টাদের কার্যক্রম তাদের বিতর্কিত করছে।

যে কথা বলতে চাই সেটা হলো এই আবেগী মানুষগুলোর আবেগকে কি রাজনৈতিক দলগুলো মূল্যায়ন করবেনা? ফ্যাসিস্ট রেজিমের অপশাসনের বিরুদ্ধে শহীদ হওয়া হাজারো তরুণের রক্ত কি বৃথা যাবে এবারোও? মৃত্যু যন্ত্রনায়
অতিষ্ঠদের আর্তনাদ কি বৃথা হতে চলেছে। আমরা কি আবারো ৭১ পরবর্তী পরিস্থিতি দেখব, নাকি বিশ্ব মানচিত্রে শক্তিশালী জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবো। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের ৯ মাস পরেও দৃশ্যত কোন অগ্রগতি হয়নি। অথচ শ্রীলংকা কত দ্রুত অবস্থার উন্নতি ঘটিয়েছে।

রাজনীতিবিদদের ত্যাগ স্বীকৃত। দ্বিতীয়বার স্বাধীনতা অর্জিত হবার পরে আমরা দুঃস্বপ্নে ফিরে যেতে চাই না। শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই। অপার সম্ভাবনাময় দেশটাকে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের, আর সহযোগিতা করা জনগণের দায়িত্ব। সরকারের উচিত হবে জুলাই বিপ্লবের সব স্টেকহোল্ডারের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করে কাংখিত রোডম্যাপ ঘোষণা করা।

বাংলাদেশের মানুষ আবেগপ্রবণ, আশাবাদী। ৫২,৭১ এবং ২৪ এর অনুপ্রেরণায় নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমাদের সবাইকে কাজ করতে হবে। যে বাংলাদেশ হবে সাম্য, মানবিক এবং সবার। বাংলাদেশের জনগণ বীভৎস কালো অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি দেখতে চায়না। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এক নতুন বাংলাদেশের জন্য।

এ. এম. হেলাল
নির্বাহী পরিচালক
ইন্সটিটিউট ফর স্যোশাইটাল গ্রোথ ( ISG)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *