দুপুর ২:০৮ বুধবার ১৯শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ ৫ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

আপনার সংবাদ

চিকিৎসককে থাপ্পড় দিয়ে পা ধরে ক্ষ্মা চাইলেন শ্রমিক নেতা

শরীয়তপুর প্রতিনিধি :
শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসকের গায়ে হাততোলা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা এলিম পাহাড়ের মীমাংসার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।
রবিবার (০৫মে) ভাইরাল হওয়া এক মিনিট চার সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে শরীয়তপুর ১ আসনের সংসদ সদস্যর উপস্থিতিতে চিকিৎসকের পা ধরে মাফ চাইতে দেখা গেছে ওই শ্রমিক নেতাকে। তিনি শরীয়তপুর জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যনির্বাহী সভাপতি।
শনিবার (৪মে) বিকালে শরীয়তপুর ১ আসনের সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন অপুর বাসভবনে এই মীমাংসার ঘটনা ঘটে। এর আগে শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে জরুরী বিভাগে মেডিকেল অফিসার ডাক্তার শেহরিয়ার ইয়াছিন ও তত্ববধায়ক হাবিবুর রহমানকে লাঞ্ছিত করেন ঐ শ্রমিক নেতা।
শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল ও সদর থানা সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুর শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যনির্বাহী সভাপতি এলিম পাহাড়ের ছেলে অভি পাহাড় (১৫) মারামারিতে মাথা ফেটে আহত হন। মাথায় আঘাত প্রাপ্ত হয়ে আহত অবস্থায় তাকে সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন। এসময়ে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে জরুরী বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসক ছিলেন ডাক্তার লিমিয়া সাদিয়া। তিনি অন্য একটি রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন আর তার পাশেই ময়নাতদন্তের রিপোর্ট তৈরি করছিলেন ডাক্তার শেহরিয়ার ইয়াছিন। তখন ওই শ্রমিক নেতা ডাক্তারকে ডাকেন তার ছেলেকে চিকিৎসা দিতে। তখন ডাক্তার সেহরিয়ার বলেন আমি এখন দায়িত্বে নেই, ময়না তদন্তের রিপোর্ট তৈরি করছি। একটু অপেক্ষা করেন আপনি যেহেতু বলছেন রিপোর্টটি লিখে দেবো। তখন ডাক্তার দেরি করে আসায় ডাক্তারের উপর ক্ষিপ্ত হন এলিম পাহাড়। একপর্যায়ে ডাক্তাদের গালাগাল করতে থাকলে ডাক্তার শেহরিয়ার তাকে গালাগাল করতে নিষেধ করলে ডাক্তার শেহরিয়ার ইয়াছিনকে জরুরি বিভাগে সকলের সামনেই চর থাপ্পড় দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

এই সময় হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হাবিবুর রহমান বাকবিতন্ডা শুনে তিনি থামাতে এলে তার সাথে খারাপ আচারণ করেন এবং গায়ে হাত তোলেন। এ ঘটনায় ঘন্টাব্যাপী হাসপাতালে সকল কার্যক্রম বন্ধ রাখে চিকিৎসকরা। পরে চিকিৎসক শাহরিয়ার বাদী হয়ে সদরের পালং মডেল থানায় বিকালে একটি মামলার আবেদন করলে পুলিশ এলিম পাহাড়কে আটক করেন। পরবর্তীতে শরীয়তপুর ১ আসনের সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন অপুর মধ্যস্ততায় ঘটনাটি মীমাংসা হওয়ার পর সন্ধ্যায় মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন করেন ওই চিকিৎসক। পরে পুলিশ আটক এলিম পাহাড়কে ছেড়ে দেন। আর এই মারধরের ঘটনায় চিকিৎসক শাহরিয়ার ইয়াছিন কানে ও কন্ঠনালীতে আঘাত প্রাপ্ত হয়।

অন্যদিকে এই ঘটনায় শরীয়তপুর ১ আসনের সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন অপুর তৎপরতায় ও তার উপস্থিতিতে তার বাসভবনে ডাক্তার ও শ্রমিক নেতা এলিম পাহাড়ের মধ্যে মীমাংসার বৈঠকের একটি ভিডিও আজ রবিবার (৫মে) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পরে। ১ মিনিট ৪ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, সংসদ সদস্যর বাসভবনে হামলার শিকার চিকিৎসকরা সহ কয়েকজন চিকিৎসক বসে আছেন। সংসদ সদস্য এলিম পাহাড়কে তাদের পায়ে ধরে মাপ চাইতে বলছেন। তখন এলিম পাহাড় দুই চিকিৎসকের মধ্যে প্রথমে ডাক্তার শেহরিয়ার পায়ে ধরে এবং পড়ে তত্ববধায়ক হাবিবুর রহমান এর কাছে পা ধরে ক্ষমা চান। এ সময় তাকে সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন অপুর পায়ে ধরতেও দেখা যায়। তখন সংসদ সদস্য এলিম পাহাড়ের হাত তার পায়ের কাছ থেকে সরিয়ে নিতে বলেন এবং কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। সংসদ সদস্য বলেন নিজের মান-সম্মান নিজে খেয়েছো এখন এখান থেকে বের হয়ে যাও। এই সময় ভিডিওতে পালং মডেল থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মেজবাউদ্দিন আহমেদ, যুবলীগ নেতা প্যানেল মেয়র বাচ্চু বেপারী, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সিদ্দিক পাহাড় ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিব) শরীয়তপুর জেলা শাখার সভাপতি ডা. মনিরুল ইসলাম সহ বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে দেখা যায়।
মীমাংসার বিষয়ে জানতে চাইলে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক হাবিবুর রহমান বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা কমিটির সভাপতি। ঘটনাটি না বাড়িয়ে মীমাংসা করার জন্য তিনি অনুরোধ করেছেন। তাই তার উপস্থিতিতে ওই ব্যক্তি ক্ষমা চেয়েছেন। তাই তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী চিকিৎসক ডাক্তার শেহরিয়ার ইয়াছিন বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য অনুরোধ করায় আমি মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করতে বাধ্য হয়েছি। আমার কানের পর্দা ও কন্ঠনালীতে আঘাত লেগেছে। নাক-কান ও গলা বিমেষজ্ঞর পরামর্শে তার কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা ঢাকায় করাতে দিয়েছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা এলিম পাহাড়, মুঠোফোনে বলেন, শরীয়তপুর ১ আসনের সংসদ সদস্য আমাগো মুরুব্বী। মুরুব্বী কইছে তাই মীমাংসা হইয়া গেছি। আমি আর এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করি নাই। আমার ছেলেরে অন্য জায়গার চিকিৎসা করাইতেছি। আমি যে ডাক্তারদের কে মেরেছি এ বিষয়ে যত নিউজ হয়েছে প্রত্যেকটি নিউজের কমেন্টে মানুষজন আমাকে বাহবা দিয়েছে। আমি নাকি উচিত কাজটি করেছি। তবে এই ঘটনাটার মধ্যে দিয়ে ডাক্তারদের একটা উচিত শিক্ষা হলো।
পা ধরে মাফ চাওয়ার ভিডিও ভাইরাল এ বিষয়ে জানতে চাইলে, তিনি বলেন ভিডিও ভাইরাল হয়েছে তো কি হয়েছে? দুই তিন দিন ফেসবুকে মানুষ দেখব তারপর সব ভুলে যাইব। আমি শ্রমিক নেতে এলিম পাহাড়, এলিম পাহারই থাকবো, আমার মান-সম্মান একটুও কমবো না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা পুলিশ সুপার শরীয়তপুর মো: মাহবুবুল আলম (পিপিএম) বলেন, শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসকে লাঞ্ছিত ঘটনায় ভুক্তভোগী জেলা পুলিশের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করে। অভিযোগের সাথে সাথেই ঘন্টাখানেকের মধ্যে আসামী এলিম পাহাড়কে গ্রেফতার করে পুলিশ। কিন্তু আসামি গ্রেফতারের পর ভুক্তভোগী তার অভিযোগ পত্রটি তুলে নেন। যার কারণে কোন মামলা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *