দুপুর ১:২৯ বুধবার ১৯শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ ৫ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

আপনার সংবাদ

কারণ বিশ্লেষণ :আমরা এমন কেন?

কারণ বিশ্লেষণ: আমরা এমন কেন?
——————————————–
আজকে আমরা হালালকে হারামের সাথে, বৈধতাকে অবৈধতার সাথে, সততাকে অসততার সাথে, নীতিকে দূর্নীতির সাথে এমনভাবে মিশিয়ে ফেলেছি যে, ইসলামের যে সৌন্দর্য দেখে যুগে যুগে মানুষ ইসলামের ছায়াতলে এসেছে; প্রাণপ্রিয় দেশ বাংলাদেশের মুসলমান যেন এর পুরোটাই ব্যতিক্রম।

বাংলা মিডিয়াম থেকে শুরু করে ইংলিশ মিডিয়াম সবাই স্মার্টনেস শুধু পোশাকেই খোঁজে পায়, বাংলার সাথে ইংরেজি মিশিয়ে এক জগিখিচুরি ভাষার মধ্যেই খোঁজে পায়। মেসি, নেইমার কিংবা মুখে উচ্চরণ করা যায় না এমন কিছু আইডলের মধ্যেই যেন আধুনিকতার ও উদার মনমানসিকতার বহিঃপ্রকাশ । সবার মেসি, নেইমার কিংবা কে কম বয়সে বিলিয়নেয়ার হয়েছে কিংবা কোন মডেল কিভাবে কী করলো আজ এগুলোই জীবনের চালিকাশক্তি। কিন্তু আফসোসের বিষয় ৯২% মুসলিমদের দেশে কী হওয়া উচিং ছিল! আমাদের নবীই তো সেই নেতা যিনি বিশ্বমাবতার মুক্তির দূত যাঁকে কিনা বিধর্মীরাও ১০০ জন প্রভাবশালী নেতার মধ্যে সর্বপ্রথম স্থান দিয়েছেন। আমাদেরতো রয়েছে হযরত আবুবকর (রাঃ), উমর (রা:), উসমান (রা:), আলী (রা:) এর মতো শত সহস্র অনুকরনীয় নেতা। আমার পরিচিতদের যারা সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত তাদের প্রায়ই একটা প্রশ্ন করি, আমার নবীর জীবনীটা দখার সুযাগ হয়েছে কী! জীবনের এতটা সময় পার হয়ে এসেছি, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলা অর্থসহ কোরআন তিলাওয়াত করেছেন কী? ফুটবল নিয়ে যে উম্মাদনা, একটি বিজয়কে ইসলাম কিভাবে উদযাপন করতে বলেছে, জানেন কী? একটা হাদিসের বই শেষ পর্যন্ত পড়েছেন কী? এইযে পোশাকটা পড়েছেন, এই পোশাক ইসলাম সমর্থন করে কী? বিয়ের ব্যাপারে ইসলাম কী বলে জানা আছে কী; গায়ে হলুদের ব্যাপরেই বা ইসলাম কী বলে? সন্তান জন্ম হলে কী করা উচিৎ? ইনকামের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভংগি কী? জাকাত তথা ইসলামী অর্থব্যবস্থা কী হওয়া উচিৎ? বন্ধু নির্বাচনের ব্যাপারে ইসলাম কী বলে? নেতার কী বৈশিষ্ট্য থাকা উচিৎ? এই যে ব্যবসা Loan নিয়ে করছেন, জানেন ইসলাম কী বলে? বিশ্বাস করেন এরকম শত শত প্রশ্নের কোন উত্তর আমাদের জানা নেই। কেউতো বলেই ফেলবে ভাই আপনি একটু বেশি বোঝেন? আজ ইসলাম শুধু বইয়ে, আর কিছু মানুষ বলবে চর্চা না করলে কী হবে অন্তরে আছে। আজ আমরা কোরআন আর হাদিসের বই বাদ দিয়ে উপন্যাস, গল্পে ব্যস্ত। ফেইসবুক, ইউটিউবে কেউ একজন কিছু লেখলো বা বানালো তা শেয়ার করতে ব্যস্ত। একটা মানুষ যদি ন্যূনতম HSC পাশ করে তাকে কম করে হলেও ১২/১৩ বছর শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত থাকতে হয়। অথচ এতো দীর্ঘ সময়ে একটা হাদিসের বই, একটা ইসলামের বই পড়ার সুযোগ হয় না, আফসোস!

এ জাতি এখন হাফ প্যান্ট পড়ে স্মার্ট সাজবে নাতো কী করবে? অথচ সে জানেনা সে পোশাক হারাম না হালাল। এ জাতি আজ জায়নামাজ বিছিয়ে প্রভাব খাটিয়ে জায়গা দখল করে সবার পড়ে এসে সবার সামনে দাঁড়ায়, কিন্তু প্রশ্ন আসেনা কী করছি? এ জাতিই রমজান আসতে না আসতেই জিনিস পত্রের দাম বাড়িয়ে দিয়ে হালাল ব্যবসাকে হারাম করতে পিছপা হয় না।! এ জাতিই নেশাখোর দু্শ্চরিত্রের মানুষকে চালকের আসনে বসিয়ে তাদেরকে বড় ভাই বা হুজুর হুজুর বলে কিছু টাকার বিনিময়ে নীতিকে বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। এ জাতিই কিছু উপড়িপাওনার লোভে, এটা নাই ওটা না বলে হয়রানি করে স্বাভাবিক ফাইলকে অস্বাভাবিক করে, ভয় ভীতি দেখিয়ে উৎকোচ নিতে এতটুকু দ্বিধা করে না। এই জাতিই সংকটকালে সবকিছুকে সিন্ডিকেট করে বৈধ জিনিসকে অবৈধ করে বড় মানুষ সাজার ভান ধরে! দান করবে তাও যেন খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। এই জাতিই নিজের দেশের ক্রিকেটের বিজয়কে বাদ দিয়ে অন্য দেশের ফুটবল জয়ে মাতবে নাতো কী করবে? আর এ জাতির আজ ভালো যেকোন কিছুই যেন দুর্লভ। তাইতো আজ লিচু কলা পাকে কার্বাইড দিয়ে আর পাকা জিনিসটা যাতে নষ্ট না হয় তাই দেয়া হয় ফরমালিন। অবৈধ হরমোন আর এন্টিবায়োটিকের বদৌলতে আড়াই মাসে জোটে ব্রয়লার মুরগি। তরমোজ লাল হয় পটাশিয়াম পারম্যাংগানেটের বদৌলতে। মরিচে মেশানো হয় ইটের গুড়ো। দুধ ঘনো হয় মাড় কিংবা মেলামাইন দ্বারা। গরুর মাংসের জায়গা দখল করে কুকুর বিড়াল। শাক সবজি সতেজ থাকে কপার সালফেটের বদৌলতে। মুড়িতে ইউরিয়া মেশানো নিত্য নৈমত্তিক ব্যাপার। যারা এই সকল কাজের সাথে জড়িত তাদের ইনকাম হালাল। তাদের সবার শরীরে আজ ফরমালিন যা হারামকে হালাল এবং অবৈধতাকে বৈধতা দিয়েছে।

বর্তমান এই অবস্থার জন্য এমন কিছু আয়াত খোঁজে পাওয়া যায় তা যেন এই সমাজ ব্যবস্থার জন্যেই। সূরা আরাফের ৫১ নং আয়াতে বর্তমান সমাজের এই অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানুতাআ’লা কী সুন্দর করে বলছেন।
”তারা স্বীয় ধর্মকে তামাশা ও খেলা বানিয়ে নিয়েছিল এবং পার্থিব জীবন তাদের কে ধোকায় ফেলে রেখেছিল। অতএব, আমি আজকে তাদেরকে ভুলে যাব; যেমন তারা এ দিনের সাক্ষাৎকে ভুলে গিয়েছিল এবং যেমন তারা আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করত। —আল-আরাফ ৫১”। সূরা আল-কাহফের দুটি অসাধারণ আয়াত আমরা পাই, যা বর্তমান সময়ের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। একটি আল্লাহ সুবহানু তা’আলাকে বাদ দিয়ে অন্যকে অভিভাবকরূপে (যা আমাদের সমাজের এখন এক প্রকার সাধারণ ঘটনা ) গ্রহণ করার পরিণাম সম্পর্কে : ”যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করেছে তারা কি মনে করে যে, তারা আমার পরিবর্তে আমার বান্দাদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে? আমি সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের অভ্যর্থনার জন্য প্রস্তুত রেখেছি জাহান্নাম।– আল-কাহফ ১০২”। আর অন্য আয়াতটি (১০৩ নং) লোক দেখানো আমল সম্পর্কে যা বর্তমান সময়ের এক দূরারোগ্য ব্যাধি:
قُلۡ هَلۡ نُنَبِّئُکُمۡ بِالۡاَخۡسَرِیۡنَ اَعۡمَالًا ﴿۱۰۳﴾ؕ
অর্থ: বল, ‘আমি কি তোমাদেরকে এমন লোকদের কথা জানাব, যারা আমলের দিক থেকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত’?

কবে জাগবে সেই বিবেক, কবে হবো আমরা সেই মানুষ যেই মানুষ কে দেখে বেধর্মীরাও নিরাপদ বোধ করতো, দলবেঁধে ইসলামের পতাকাতলে আসতো! ইনশাআল্লাহ আবার আসবে সেই দিন, জাকাত নেয়ার একটি লোকও খোঁজ পাওয়া যাবে না, ভেজাল হয়ে যাবে দুর্লভ, হারামকে হালাল তার পাওনা বুঝে নিবে।

লেখক :আরিফ মাহমুদ হাওলাদার

PhD Fellow, ideSHi
Ex- Research Officer, icddr,b
Ex- R & D Officer, Incepta Pharmaceuticals Ltd,
Ex- Scientific Officer, BTRI.
Founding Director, The Scholars’College.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *