দুপুর ১:০৪ বুধবার ১৯শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ ৫ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

আপনার সংবাদ

এক নির্ভীক যোদ্ধার নাম শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার

শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার। এটি শুধু একটি নামই নয়, একটি আদর্শ। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক, জনপ্রিয় রাজনীতিক, বীরমুক্তিযোদ্ধা, গণমানুষের অতি কাছের মানুষ। ছিলেন মেহনতি শ্রমিকের বন্ধু। তাঁর আলোয় আলোকিত হয়েছিল গোটা গাজীপুর।

১৯৫০ সালের ৯ নভেম্বর গাজীপুরের হায়দারাবাদ গ্রামে জন্ম আহসান উল্লাহ মাস্টারের। আমৃত্যু তিনি কাটিয়ে গেছেন কুঁড়েঘরে। ঘুণেধরা সমাজ আর পচনশীল রাজনীতির স্রোতে তিনি ভাসাননি গা। ছিলেন একেবারেই ব্যতিক্রম। নীতি-নৈতিকতা ছিল তাঁর অনন্য সম্পদ। ফলে সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতিকে পেছনে ফেলে তিনি অবিরাম ছুটেছিলেন সাধারণ মানুষের কাছে। জয় করেছেন তাদের মন, ভালোবাসা।

বাঙালির সম্মান, গৌরব, মূল্যবোধ ও আত্মমর্যাদা বৃদ্ধিতে যে সকল রাজনীতিবিদ নিজেকে উৎসর্গ করেছেন তাদের মধ্যে একজন শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার। শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন তিনি। তাঁর সংগ্রাম ছিল শ্রমিক-কৃষক- মেহনতি জনতার জন্য। তাঁদের জন্যই তিনি রাজনীতি করেছেন। খেটে খাওয়া মানুষসহ সবাইকে আপন করে নেয়ার এক দুর্লভ গুণ তাঁর মধ্যে ছিল। শ্রমিকদের অভাব-অভিযোগ নিয়ে এবং তাদের স্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টায় কোনোদিন তাঁকে পিছপা হতে দেখা যায়নি। শ্রমবিষয়ক আন্দোলনে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা হলে, সেই মামলার আইনি লড়াইয়ের জন্য আইনজীবী নিয়োগ ও মামলা পরিচালনার জন্য তহবিল গঠনসহ বহুবিধ কর্মযজ্ঞের সাথে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার পরিচিত হয়েছেন। ঢাকা-টঙ্গী-গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতিত ও ভোগান্তির শিকার শ্রমিকদের জন্য মামলা বিষয়ক আইনি লড়াইয়ের জন্য নিরলস ছুটে যেতেন তিনি।

একজন সৎ ও আদর্শবান রাজনীতিক ও সমাজসেবকের যেসব সদগুণ থাকা উচিত, তার সবই আহসান উল্লাহ মাস্টারের মধ্যে ছিল। শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার এমপি ছিলেন আপাদমস্তক দেশপ্রেমিক। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার পথে তিনি ছিলেন একজন মাঠের দক্ষ কর্মী। তিনি ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জননেত্রী শেখ হাসিনার সোনার বাংলা বিনির্মাণ ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।

শিক্ষাজীবন শেষে গাজীপুরের টঙ্গীর রেলস্টেশন সংলগ্ন নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা পেশা শুরু করেন তিনি। জীবনের ২৫টি বছর কাটিয়ে দিয়েছেন শিক্ষকতা পেশায়। শিক্ষকতাকেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন সমাজ বদলের হাতিয়ার হিসেবে। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, মানুষকে শিক্ষিত করে তুলতে পারলেই সমাজ থেকে চিরতরে দূর হয়ে যাবে অন্যায়-অনাচার, অত্যাচার-অবিচার। শিক্ষার কারণে বদলে যাবে মানুষের ভাগ্য। সে লক্ষ্যেই তিনি কাজ করেছেন নিরন্তর।জনপ্রিয় এই শিক্ষক ১৯৮৩ ও ১৯৮৯ সালে পরপর দু’বার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ১৯৯০ সালে গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। তৃণমূল থেকে উঠে আসা বহুমাত্রিক এই রাজনীতিক ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিপুল ভোটে গাজীপুর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তিনিসন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অস্ত্রের ঝনঝনানির বিরুদ্ধেপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন । মাদকের বিরুদ্ধে ছিলতার শক্ত অবস্থান। সব মিলিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের আপনজন হয়ে উঠেছিলেন খুব অল্প দিনেই। কিন্তু ভাগ্যের কি নর্মম পরিহাস, জনপ্রিয় এই রাজনীতিককে চলে যেতে হলো খুব অল্প দিনেই। অকালেই ঝড়ল তাজা একটি আদর্শের প্রাণ। ২০০৪ সালের ৭ মে শুক্রবার ‘হাওয়া ভবনের’ পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে হত্যা করা হয় আহসান উল্লাহ মাস্টারকে। দেশ হারায় নন্দিত মানুষকে, যিনি ছিলেন সহস্র তরুণের আদর্শ, যিনি ছিলেন জনকল্যাণমুখী চিন্তাধারার একজন রাজনীতিবিদ ও একজন মানুষ গড়ার কারিগর। তাঁরমৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে হতভম্ব হয়ে পরে গাজীপুর তথা সমগ্র দেশের মানুষ। ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল যেনো ঢেকে যায় কালো চাদরে। কোটি কোটি মানুষ মাতম করতে থাকে এই মহীরুহের অকাল প্রস্থানে। রেল ষ্টেশন, টার্মিনাল, বিমান বন্দর, বাস, ট্রাক, ট্রেন ও আকাশ পথে তখন একই আলোচনা- নক্ষত্রের অকাল বিদায়! ধিক্কার জানাতে থাকে লাখো কোটি মানুষ বিপথগামী সেই ঘাতকদের। কান্নার রোল ওঠে সাধারন মানুষের মধ্যে। শোকের নগরীতে পরিণত হয় টঙ্গী ও গাজীপুর । প্রতিবাদে সেদিন টঙ্গী-গাজীপুরকে রাজধানী সহ সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় গাজীপুরের শ্রমিক-জনতা। সেদিন বোঝা গিয়েছিল, আহসান উল্লাহ মাস্টার গাজীপুরের মানুষের কাছে কতটা জনপ্রিয়। গাজীপুরের মানুষ কতটা ভালোবাসেন তাদের প্রিয় শিক্ষককে, নির্ভিক জননেতাকে।

আহসান উল্লাহ মাস্টারের সঞ্চয় ছিল শুধু মানুষের ভালোবাসা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার লোভ ও লালসার ঊর্ধ্বে থেকে গণমানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। সেবার দ্বারা ও মহৎ কর্মের মাধ্যমে আলোর প্রদীপ হাতে নিয়ে যে মানুষটি অবদান রেখেছিলেন সংগ্রাম-আন্দোলনে, সে মানুষটি আজ তার নিজ গ্রামে চিরনিদ্রায় শায়িত। শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার প্রমাণ করেছেন মানুষকে ভালোবাসলে, তাদের জন্য কাজ করলে মানুষ ভালবাসায় তার প্রতিদান দেয়। তাইতো মরেও বেঁচে আছেন আহসান উল্লাহ মাস্টার, গাজীপুর তথা সমগ্র বাংলাদেশের শ্রমিক জনতার মনিকোঠায়। প্রায় দেড় যুগ আগে ঘাতকের বুলেট জীবন প্রদীপ নিভে দিলেও আহসানউল্লাহ মাস্টার আজ আরো দীপ্তময়, আরো বেশি জনপ্রিয়। কিছু কিছু প্রাণ আছে দৃশ্যত মরে গেলেও তাঁর সৃজনীশক্তি ও কর্মযজ্ঞ তাঁকে অমরত্ব দান করে। পৃথিবী ও সভ্যতা তাঁদের দানে হয় সমৃদ্ধ। তেমন একজন ব্যক্তিত্ব শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার।

 

লেখক : মোহাম্মদ মোস্তফা হুমায়ুন হিমু

রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *