রাত ৮:৫৪ বৃহস্পতিবার ১৬ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ৩রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সবার আন্তরিক ও সহযোগিতায় আমি এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি : সামি দোহা

 

এই সাক্ষাৎকারটি দয়া করে পড়বেন না, যদি আপনার শিল্প, সাহিত্য, থিয়েটার, অভিনয় বা স্ট্যান্ড-আপ কমেডি নিয়ে খুব উচ্চমার্গীয় ধারণা ও অহংবোধ থেকে থাকে। এখানে সবকিছুই সামি দোহার ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনার প্রতিফলন। সমাজের প্রচলিত ধাঁচ অনুযায়ী সবকিছু হবে—এমন প্রত্যাশা করা এই সাক্ষাৎকারে অবান্তর। ধন্যবাদ।

ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবন

1. আপনার কমেডি ও অভিনয়ের যাত্রাটা কীভাবে শুরু হলো?

— একদম সোজাভাবে এবং অল্প কথায় বললে—দেখতে দেখতে! ২০০৬ বা ২০০৭ সাল থেকেই ইউটিউবে বিশ্বখ্যাত অনেক স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ানের ভিডিও দেখতাম। পরে ২০১০ সালে নাভিদ মাহবুব ভাই বাংলাদেশে কমেডি ক্লাব শুরু করলে সেখানে দর্শক হিসেবে যেতে শুরু করি। এরপর কাজের সুবাদে পৃথিবীর নানা দেশে ঘুরে বেড়ানোর সময় সেই দেশের কমেডি ক্লাবগুলোতেও যেতাম। দর্শক সারি থেকে দেখতে দেখতে একদিন মনে হলো—ওপেন মাইকে গিয়ে নিজেই একবার চেষ্টা করে দেখি।

ওপেন মাইক হলো এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে নতুন কমেডিয়ানরা কমেডি করার সুযোগ পায়, আর অভিজ্ঞ কমেডিয়ানরাও নতুন মেটেরিয়াল ট্রাই করেন। সেখান থেকেই শুরু ২০১৯ সালে। আসলে প্রায় সব বিখ্যাত বা অখ্যাত স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ানই ওপেন মাইক থেকেই শুরু করেন।

অভিনয়টা কোনো পরিকল্পনায় ছিল না। স্ট্যান্ড-আপ কমেডি করতে করতে মনে হলো আমি নিজেকে আরও উন্নত করতে পারছি না, আমার পারফরম্যান্স কেন জানি ফ্লাটলাইন হয়ে যাচ্ছে। সেই চিন্তা থেকে মঞ্চে নিজেকে শাণিত করার জন্য বাতিঘর থিয়েটারের একটি ওয়ার্কশপে যোগ দিই। পরে সেই দলটিরই সদস্য হয়ে যাই। কেমন করে যেন একসময় মঞ্চেও দাঁড়িয়ে গেলাম—এই তো!

2. শুরুর দিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?

— চ্যালেঞ্জ! আসলে ঢাকা শহরে কিছু করা মানেই চ্যালেঞ্জ। ট্র্যাফিক জ্যাম পেরিয়ে কাজের ফাঁকে ফাঁকে শিল্পকলায় রিহার্সালে যাওয়া, গুলশান–বনানী–ধানমন্ডিতে কমেডি শো করা—সপ্তাহজুড়ে ব্যস্ততা থাকতো, এখনো থাকে। তবু সত্যি বলতে কী, থিয়েটার এবং স্ট্যান্ড-আপ কমেডি—দুই ক্ষেত্রেই সবার এত আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছি যে, সেই মুহূর্তগুলোর জন্যই বারবার ঢাকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাওয়া যায়। আমাদের কমিউনিটির মানুষজন অসাধারণ!

3. আপনি কাকে নিজের অনুপ্রেরণা মনে করেন?

— সবাই আমার অনুপ্রেরণা। ছোট-বড় সবাই আমাকে শেখায়, এখনো শেখাচ্ছে। তবে আমি অনেকের ভক্ত—এখানে এত নাম বলা যাবে না।

কমেডি ও অভিনয়

4. কমেডি লেখা আর পরিবেশন—কোনটা বেশি কঠিন বলে মনে হয়?

— স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ানদের নিজেদেরই লিখতে হয় এবং নিজেরাই পারফর্ম করে। তাই আলাদা করে কোনটা বেশি কঠিন—এটা বলা যায় না। দুটোই একই আর্টের পার্ট।

5. কীভাবে আপনি নতুন চরিত্র বা কনসেপ্ট নিয়ে কাজ করেন?

– অভিনয় নিয়ে তো আসলেই বিস্তর গবেষণা এবং থিওরি আছে। আমি প্রচণ্ড মূর্খ মানুষ এসব ব্যাপারে। এ প্রশ্নটা আসলে খুব বড় মাপের অভিনেতা বা অভিনেত্রীদের করা প্রয়োজন। তবু যদি আমাকে বলতেই হয়, তাহলে বলবো—নতুন চরিত্র নিয়ে কাজ করা মানে চরিত্র নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা, পুরো স্ক্রিপ্ট বোঝা এবং অন্যান্য চরিত্রগুলোকেও ভালো করে বোঝা, এবং সেই সাথে রিহার্সাল ও প্র্যাকটিস—সবকিছুই ইম্পরট্যান্ট। অভিনেতা বা অভিনেত্রীর নিজস্ব চিন্তাভাবনা, মনোযোগ, শিক্ষা-দীক্ষা—সবকিছুই আসলে তার পর্দার চরিত্রে প্রতিফলিত হয়। ছোট চরিত্র বলে কোনো কিছু নাই। প্রত্যেকটা চরিত্র নিয়ে প্রচুর কাজ করার স্কোপ থাকে, এমনকি সেটা মঞ্চে অথবা পর্দায় পাঁচ সেকেন্ডের উপস্থিতি হলেও।

6. দর্শকদের হাসানো আপনার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

— একদমই না। জোর করে মানুষকে হাসানো যায় না। কোনো জটিল বা সহজ বিষয় নিয়ে নিজের চিন্তাভাবনাকে পাঞ্চলাইনের ছকে উপস্থাপন করাটাই (আমার সংজ্ঞায়) স্ট্যান্ড-আপ কমেডি। কিন্তু যদি সেখানে জোর করে হাসানোর চেষ্টা থাকে বা চিন্তার গভীরতা না থাকে, তাহলে মানুষ কখনোই সংযোগ অনুভব করে না। তখন মানুষ হাসেনা।

আর স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান যখন দেখে মঞ্চে সে যাই বলছে না কেন, মানুষ হাসছে না -তখন এটা প্রচন্ড চ্যালেঞ্জিং। একটা ভয়ংকর শূন্যতা অনুভব হয় তখন। মঞ্চের সব আলো মুখে নিয়ে বুকের ভেতরে প্রচন্ড অন্ধকার – এই অদ্ভুত বৈপরীত্য নিয়ে মঞ্চে থাকতে হয় যতক্ষণ না তার পার্ট শেষ হচ্ছে।

স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ানদের প্রচণ্ডভাবে সৎ এবং নিজস্ব হতে হয় মঞ্চে।

ভিন্ন অভিজ্ঞতা

7. লাইভ শো আর স্ক্রিন পারফরম্যান্সের মধ্যে পার্থক্য কী?

— পুরোপুরি ভিন্ন। লাইভ শোতে, যেমন থিয়েটারে, আপনাকে চরিত্রের মধ্যে পুরোপুরি ঢুকে যেতে হয়—ভুল করার সুযোগ নেই। স্ক্রিনে অবশ্য বারবার শট দেওয়ার সুবিধা থাকে। তবু আমার কাছে দুটোই সমান চ্যালেঞ্জিং।

8. কোনো স্মরণীয় পারফরম্যান্সের ঘটনা শেয়ার করবেন?

— আমি খুব ছোটখাটো অভিনেতা ও কমেডিয়ান। “আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি”—এই পর্যন্তই সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমার ইন্টারঅ্যাকশন।

তবু বলতে পারি, Begum’s Blunder থিয়েটার প্রোডাকশনে টানা দুই সপ্তাহ আটটি হাউসফুল শোতে অভিনয় করা, যেখানে প্রত্যেকবার দর্শক দাঁড়িয়ে করতালি দিয়েছেন, কিংবা বাতিঘরের Monkey Trial প্রোডাকশনে অভিনয় করা—এসব আমার কাছে ভীষণ স্মরণীয়। আসলে গত পাঁচ বছরে প্রচুর স্মরণীয় শো হয়েছে, তবে এতোটুকু বলতে পারি বাচ্চাদের অনুষ্ঠান করে আমি সবচেয়ে বেশি মজা পাই। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন ভলেন্টিয়ারিং কাজে সংযুক্ত থাকায় ( যেগুলো নিয়ে আমি খুব বেশি প্রকাশ করি না) বিভিন্ন স্কুলে আমি বাচ্চাদের সাথে গল্প করি, আড্ডা মারি – প্রত্যেকটাই স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

ক্ষুদ্র মানুষ হিসেবে আমার অল্পতেই গর্বিত হয়ে যাওয়া বেশ নিয়মিত ব্যাপার। যেমন আমি গর্ব করে বলি—আমি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে একই সঙ্গে অভিনয় এবং স্ট্যান্ড-আপ কমেডি—দুটোই করেছি!

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

9. ভবিষ্যতে আপনি কি সিরিয়াস অভিনয়ে আসতে চান?

— আমি সবসময়ই অভিনয় নিয়ে সিরিয়াস, কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির একটা বড় সমস্যা হলো—একবার কেউ কোন রোল করলে টাইপকাস্ট করে দেয়। এখন কাস্টিং ডিরেক্টররা শুধু ৪০–৪৫ বছরের কমেডির চরিত্র এলে আমার কথা মনে করেন। আমি কিন্তু থিয়েটারে পরিশ্রম করে আসা মানুষ। আমি বারবার বলি—চ্যালেঞ্জিং কোনো রোল থাকলে ডাকুন, অডিশনের সুযোগ দিন। তারা শুধু হাসে।

10. নতুন প্রজেক্ট বা কাজ নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

– আমার আসলে নিজের কোনো পরিকল্পনা নাই। ডিরেক্টর যেভাবে চাইবে, সেভাবেই আমার ডেলিভারি করতে হবে। সেদিকেই ফোকাস করি প্রত্যেকটা প্রজেক্টের ক্ষেত্রে। আসলে সবসময়ই প্রচণ্ড সিরিয়াসলি কাজ করি। কমেডি রোল থাকলেও, ছোট ছোট ক্যারেক্টার করতে থাকলেও আমি সেগুলো নিয়ে প্রচণ্ড সিরিয়াসলি কাজ করি।

ব্যক্তিত্ব ও দর্শকদের উদ্দেশ্যে

11. একজন সফল কমেডিয়ান হিসেবে নিজেকে কীভাবে দেখেন?

— সফল বা অসফল—এটা আমার কাছে কোনো মানদণ্ড নয়। আমার সবসময় মাথায় থাকে:
“You are as good as your performance today.”
একটা শো হলো, মানুষ হাসলো, তারপর স্টেজের বাতি নিভে গেল—পরদিন আবার নতুন দিন, নতুন শো, নতুন চ্যালেঞ্জ। There is nothing romantic in this journey.

12. দর্শকদের জন্য আপনার কোনো বার্তা?

— দয়া করে শিল্পীদের দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করিয়ে নেওয়ার চেষ্টার বেহায়াপনা বন্ধ করুন। যদি আপনার কাছে কোনো শিল্পীকে যোগ্য সম্মানী দেওয়ার মতো অর্থ না থাকে, তাহলে ফেসবুকিং কমিয়ে পরিশ্রম করুন, উপার্জন করুন। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *