বিকাল ৩:৪৩ সোমবার ২৭শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজনীতির সাতকাহন :জুলাই বিপ্লব/ অভ্যুত্থান এবং আজকের বাংলাদেশ (২): এ. এম. হেলাল

রাজনীতির সাহতকাহন:জুলাই বিপ্লব/অভ্যুত্থান এবং আজকের বাংলাদেশ (২).

আজকে যে বিষয়টা দিয়ে শুরু করবো সেটা হল বিপ্লব এবং অভ্যুত্থান। চলুন বিপ্লব এবং অভ্যুত্থান সম্পর্কে সংক্ষেপে জেনে নেই। খুব সহজ কথায় বিপ্লব হল একটি মৌলিক, গভীর ও কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রক্রিয়া যা সমাজ, রাষ্ট্র অর্থনীতি বা রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল আনে। এটি দীর্ঘমেয়াদী এবং সর্বস্তরের জনগণের সমর্থন থাকে। যেমন ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব ইত্যাদি। Theda Skocpol তার গ্রন্থ States and Social Revolution (1979) তে বিপ্লব কে বলেছেন কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তর নয় বরং রাষ্ট্রীয় ও সামরিক গঠন কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের মাধ্যম। কাল মার্কস বিপ্লবকে শ্রেণী সংগ্রামের চূড়ান্ত ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন যেখানে শ্রমজীবী শ্রেণী শাসক শ্রেণীকে অপসারণ করে।

অপরদিকে অভ্যুত্থান হলো হঠাৎ কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক গোষ্ঠীর দ্বারা বিদ্যমান সরকার বা শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা। এটি প্রধানত গোষ্ঠীভিত্তিক হয়। যেমন বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থান, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান, ১৯৭৫ এর ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান, ১৯৮২ সালের ২৪ শে মার্চ এর অভ্যুত্থান। ২০২১ সালের মিয়ানমারের অভ্যুত্থান, ২০১৩ সালের মিশরে অভ্যুত্থান, ২০১৪ সালে থাইল্যান্ডের অভ্যুত্থান প্রভৃতি। স্যামুয়েল পি হান্টিংটন তার বিখ্যাত বই Political Order in Changing Societies (1968) তে অভ্যুত্থানকে তিনি স্থিতিশীল রাজনৈতিক ফল হিসেবে দেখেছেন। যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়লে সামরিক বা গোষ্ঠীগত হস্তক্ষেপ ঘটে।

প্রশ্ন হল, বাংলাদেশের সংঘটিত জুলাই আন্দোলনকে কি বলে অভিহিত করবেন বিপ্লব নাকি অভ্যুত্থান? এটা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। তবে যে বিষয়টা নিয়ে বিতর্ক নেই সেটা হলো বাংলাদেশে বিগত ১৫ বছর ধরে চলে আসা সকল অন্যায় অত্যাচারের জবাব দিয়েছে সাধারণ মানুষ জুলাই আন্দোলনে। যে আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত,সার্বজনীন। যেখানে কোন কান্ডারী ছিল না। সবাই নিজ নিজ তাগিদে অংশগ্রহণ করেছিল বাঁচার তাগিদে। সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশায়। যে দেশ হবে সবার। থাকবেনা কোন বৈষম্য। ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতায় থাকবে শাসকগোষ্ঠী। জুলাই আন্দোলন ছিল ফ্যাসিস্ট রেজিম এর বিরুদ্ধে তীব্র বঞ্চনার বহিঃপ্রকাশ।পরিবারতন্ত্র, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি আর মত প্রকাশের প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম।

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও যে দেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছাতে পারেনি সেটা হলো প্রিয় বাংলাদেশ। কাঙ্ক্ষিত স্থানে না পৌঁছানোর হয়তো অনেক কারণ থাকতে পারে, তবে মূল যে কারণ সেটি হল রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন। স্বাধীনাত্তোর বাংলাদেশে কোন রাজনৈতিক দলই জনগণ তথা রাষ্ট্রের সমৃদ্ধির জন্য কাজ করেনি। যখন যে দলই ক্ষমতা এসেছে তারাই ফায়দা হাসিল করেছে। নিজেদের প্রয়োজনে ক্ষমতার কুক্ষিগত করে রেখেছে । নিজেদের ক্ষমতায় রাখার লক্ষ্যে সংবিধানে অনেকবার সংশোধনী এনেছে। এ পর্যন্ত ১৭ বার সংশোধনী আনা হয়েছে সংবিধানে। অথচ এগুলোর কোনটাই রাষ্ট্রের বৃহৎ কল্যাণের জন্য নয়, শুধুমাত্র নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার ব্যবস্থা মাত্র। বহুবার সামরিক হস্তক্ষেপ বাধাগ্রস্থ হয়েছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র। রাজনৈতিক দলগুলো সুযোগমতো খোলস পাল্টিয়েছে। সামরিক সরকারের যোগদান, নিজ দল ত্যাগ সহ বিভিন্ন ইতিহাস প্রত্যক্ষ করেছে এদেশের আবেগপ্রবণ মানুষ। ধর্মকে পুঁজি করে অনেকেই এ দেশের মানুষের আবেগকে নিয়ে খেলা করেছে। কোন কোন দল এখনো ও এদেশের মহান একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামকে স্বীকার করে না। পীর/ মাজার ব্যবসায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে অনেকদল। এরা শুধু বাংলার সহজ সরল মানুষদের নিয়ে খেলা করে ক্ষান্ত হয়নি, শেষ করে দিয়েছে অনেক পরিবার /মেধাবির স্বপ্ন।

রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের পরিবার সন্তানদের বিদেশ রেখে আয়েশি জীবনের সাধ দিচ্ছে। অন্যদিকে গ্রাম থেকে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে আশা যুবককে রাজনীতির নেশায় উন্মাদ করে রাজপথে জীবন দেয়ার মত ত্যাগ করতে দীক্ষা দেয়া হয়। কত শত তরুণের সম্ভাবনাময় জীবন ঝড়েছে তার ইয়াত্তা নেই। দেশটাকে নিজের বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি বলে মনে করছে রাজনৈতিক দলগুলো। তাছাড়া প্রতিবেশী তথা বিদেশি রাষ্ট্রগুলো তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে যথেচ্ছা ব্যবহার করেছে। আর রাজনৈতিক দলগুলোও ক্ষমতার মোহে তাদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। একেক রাজনৈতিক দলের একেক দেশ প্রীতি রয়েছে। স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটলে বিদেশী দেশগুলো মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। বিদেশি প্রতিবেশীদের সাথে সুষম সম্পর্ক না থাকায় দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, শিক্ষা-সংস্কৃতি, ধর্মীয় অনুভূতি এ ব্যাপার গুলো বরাবরই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজনৈতিক দুর্ব্যক্তায়নের ফলে। সামাজিক স্থিতিশীলতা, সহনশীলতা নষ্ট হয়েছে।

হাজারো শহীদদের রক্তের বিনিময়ে এবং অগণিত আহতদের ত্যাগের ফলেই দ্বিতীয়বার স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি। ইতিহাসে সম্ভবত শেখ হাসিনাই একমাত্র নারী ফ্যাসিস্ট যার অবৈধ ১৫ বছরের শাসন ছিল বাংলাদেশের জন্য এক কালো অধ্যায়। জুলাই বিপ্লব/ অভ্যুত্থান বা আন্দোলন যে নামেই ডাকিনা কেন সেটা ছিল বাংলার মানুষদের বাঁচার একটি মুভমেন্ট বা স্পিরিট। আগস্ট ৫ এ পতন হয় ফ্যাসিস্ট রেজিমের। বাংলাদেশ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। এবারেও যেন এ দেশের মানুষ আবেগপ্রবণ। স্বপ্ন দেখেছে নতুন এক যাত্রার। দল মত নির্বিশেষে কোটি মানুষের অকুন্ঠ সমর্থনে বাংলার সূর্য সন্তান সারা বিশ্বের গর্ব নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুস ইন্টেরিম গভর্ণমেন্টের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন। তার নেতৃত্বে গঠিত হয় উপদেষ্টা পরিষদ। এক কঠিন সময়ে দায়িত্ব নেন বিশ্বজয়ি অধ্যাপক মোঃ ইউনুস। ইন্টেরিম গভর্ণমেন্টের দায়িত্ব পড়ে তিনটি (১) ফ্যাসিস্টের বিচার (২) সংস্কার এবং (৩) নির্বাচন।
বিভিন্ন সময় উপদেষ্টা পরিষদের কলেবর বাড়ানো হয়। বর্তমানে এর সংখ্যা প্রায় ২৫। বলছিলাম বিশ্বজয়ী অধ্যাপক ইউনুস থেকে এদেশের বঞ্চিত মানুষদের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। মাঝ দরিয়ায় ঝড়াক্রান্ত জাহাজের নাবিক মোহাম্মদ ইউনুস। তিনি শক্ত হাতে হাল ধরলেই গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব। নতুবা বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।

প্রফেসর ইউনুস সরকারকে দায়িত্ব নেবার পরেই বিভিন্ন ঝামেলার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে এবং এখনো সেটা সামলাতে হচ্ছে। ফ্যাসিস্ট রেজিমের রেখে যাওয়া অনুগত প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহ সর্বক্ষেত্রেই ছিল অসহযোগিতা। আওয়ামী দুর্বৃত্তদের গোপন ষড়যন্ত্রে বিদেশি রাষ্ট্রের ছায়া হস্তক্ষেপ, প্রশাসনের ঘাপটি মেরে থাকা দোসরদের অনুচররা সর্বক্ষেত্রে অসহযোগিতা করেছে, এবং এখনো করছে। ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট রেজিমের শাসনের বীজ প্রশাসনের গোড়া থেকে বপন করা ছিল এবং তা এখনো আছে। অপরদিকে প্রফেসর ইউনুস সরকার দায়িত্ব নেবার পর থেকে বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায়ে পর্যন্ত তাদের দাবি দাওয়ার আন্দোলন নামে। হকার থেকে রিক্সাওয়ালা, প্রশাসনের নিম্নস্তর থেকে উচ্চস্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীরা এবং পেশাজীবীরা তাদের দাবির ফিরিস্তি তুলে। ঢাকা শহর যেন হয়ে ওঠে দাবী দাওয়া পূরণের শহর। শাহবাগবাগ যেন এর প্রাণকেন্দ্র। অস্বীকার করার উপায় নেই ফ্যাসিস্ট রেজিমের অনেকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আর এই দাবি দাওয়ার আন্দোলন এখনো চলমান আছে।

মন্দের ভালো এ তত্ত্বেই চলছে ইউনুস সরকার। উপদেষ্টা পরিষদের অনেকেই বিজ্ঞ – অভিজ্ঞ এবং উচ্চ শিক্ষিত। অনেকে প্রচুর পরিশ্রম করেছেন, সততার সাথে কাজ করছেন এবং সাফল্য ও পেয়েছেন। অনেকে সমালোচনাও সহ্য করেছেন। যেমন বিদ্যুৎ জ্বালানি, সড়ক ও রেলপথ উপদেষ্টা জনাব ফাওজুল কবির খান, এবং স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা লেঃ জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নাম উল্লেখযোগ্য। আবার অনেক উপদেষ্টাদের নামে অভিযোগ উঠেছে তারা এসি রুমের বাইরে যান না। রাজধানীর বাইরে কোন প্রোগ্রামে যাননি এখনও এমন উপদেষ্টাও রয়েছেন। আইন উপদেষ্টা, যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা, তথ্য উপদেষ্টা, সংস্কৃতি উপদেষ্টা, পরিবেশ ও বন উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ইতিমধ্যে বিতর্কিত হয়েছেন। বিতর্কিত হয়েছে প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা বিষয়ক হাইরিপ্রেজেনটেটিভ এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ডঃ খলিলুর রহমান। তাছাড়া প্রফেসর ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদে এনজিও ঘেরা মানুষের আধিক্য বেশি যেটা একটা চূড়ান্ত দুর্বলতা। অপরদিকে বিতর্কিত উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে প্রধান উপদেষ্টা কোন পদক্ষেপ নেননি যেটা খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত।

সবচেয়ে বড় পরিতাপের বিষয় হলো অদ্যাবধি জুলাই আন্দোলনে নিহতদের ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা করতে পারেনি । শহিদ পরিবারদের সহায়তা ও যথাযথ পুনর্বাসন করা হয়নি। আহতদের রাষ্ট্রীয় খরচে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। এটা খুব কষ্টকর যে আহতদের সুচিকিৎসার জন্য বিভিন্ন সময় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় এবং বাসভবনের সামনে অবস্থান গ্রহণ করতে হয়েছে। কিছুদিন আগে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে জুলাই আন্দোলনে আহতরা বিষপান করেছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী জুলাই আন্দোলনে নিহত এবং আহতদের জন্য গঠিত ফান্ডের কার্যক্রম গতিশীল নয় এবং ফান্ডের যথেচ্ছা ব্যবহার হচ্ছে। প্রকৃতরা সুবিধা পাচ্ছে না।

অপরদিকে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের নেতারা সরকারে আছে। সরকারের ছত্রছায়ায় দল গঠন করছে, এবং অনেকেই অনৈতিক কার্যকলাপের মাধ্যমে অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছে। তথাকথিত রাজনৈতিক দলের নেতাদের মত গাড়ি বহর নিয়ে শোডাউন করছে। গাড়িতে চলাফেরা করছে অথচ কিছুদিন আগেও এদের অস্তিত্ব ছিল না। তারা নাকি নতুন বন্দোবস্ত করতে এসেছে! দেখে মনে হচ্ছে গতানুগতিক নতুন রূপে। জুলাই শহিদদের সাথে তারাও বেইমানি করছে। নইলে এতদিনে পূর্ণাঙ্গ তালিকা এবং পুনর্বাসন ও আহতদের সু চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। অথচ এনসিপি নামে রাজনৈতিক দল গঠন হয়ে গেল আর তারা গাড়িবহর নিয়ে শোডাউন সহ বিভিন্ন নিয়োগ, বদলি তদবির বাণিজ্য জড়িত হয়ে পড়েছে। তাদের এহেন কার্যক্রমে কি জুলাই স্পিরিট ব্যাঘাত ঘটছে না?

একজন বেসরকারি চাকুরিজীবী হিসেবে যেটা প্রত্যক্ষ করছি গত নয় মাসে অর্থনৈতিক স্থবিরতা এসেছে। বিনিয়োগ নেই। দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা কম নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধুমাত্র রেমিটেন্স প্রবাহ ঠিক রয়েছে। । বিজনেস ডেভেলপমেন্ট এ কাজ করছি, অনেক M
NC, NGO, INGO এবং Development Agency এর সাথে মিট করেছি গত নয় মাসে। ফলাফল খুবই হতাশা ব্যঞ্জক। RGM থেকে শুরু করে প্রতিটা সেক্টরেই হতাশা। একজন এইচআর লিডার হিসেবে আমার কোম্পানির কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তে আসতে হয়েছে ম্যানেজমেন্টের চাপে। কারণ ব্যবসা নেই। আমাদের মত সার্ভিস প্রোভাইডার এজেন্সি গুলো তাদের বছরের প্রথম দুই কোয়ার্টারের টার্গেট অর্জন করতে পারেনি। এরকম অনেক হতাশার গল্প আসছে চারপাশ থেকে। চাকুরির বাজার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। সামান্য এক্সিকিউটিভ পজিশনের জন্য (বেতন রেঞ্জ ১৫-২০ হাজার) স্বীকৃত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে ভাল সাবজেক্টে পড়াশোনা শেষ করে পজিশন নিয়ে বের হলেও চাকরি পাচ্ছে না। একজন এইচআর প্রফেশনাল হিসেবে প্রতিনিয়তই অসংখ্য সিভি পাই। সিভি গুলো পড়ি আর হতাশ হই। রাষ্ট্র কি পারবে এদের দায়িত্ব নিতে? ওরা কি নতুন বন্দোবস্তর সুবিধা পাবে?

অন্যদিকে সোশ্যাল মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে (যেটা আমজনতার) ইন্টেরিম গভর্মেন্টের জয়জয়কার। প্রশংসায় পঞ্চমুখ, লাইক কমেন্টের জোয়ার। বিডা এবং বেজার নির্বাহী পরিচালক আশিক চৌধুরী Investment Summit করেছেন। সোশ্যাল মাধ্যমে জানতে পেরেছি অমুক দেশের, অমুকেরা বিনিয়োগ করবে কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে ইত্যাদি, ইত্যাদি। ফেসবুকে তার প্রেজেন্টেশন কে এমন ভাবে ছড়ানো হয়েছে লাইক কমেন্ট এর বন্যা দিয়ে যেন বাংলাদেশে আজই সিঙ্গাপুর হয়ে যাবে। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। দেশে বিনিয়োগ নেই। প্রতিনিয়তই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে। দেশীয় উদ্যোক্তারা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ভয়ে নতুন বিনিয়োগ করছেন না।আওয়ামী সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যবসায়ী ব্যবসা বন্ধ করে বিদেশ চলে গেছে। এতে অনেক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে এবং ভবিষ্যতে আরো পড়ার ঝুঁকি আছে।

সরকারের সহজ উপলব্ধি এমন হওয়া উচিত যে প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক না হলেও বৈরী সম্পর্ক করা যাবে না। এটা খুবই সহজ যুক্তি যে প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক খারাপ করে ভালো থাকা যায় না। বাংলাদেশ তিন দিক দিয়ে ভারত বিস্তৃত এবং একদিকে বঙ্গোপসাগর। সম্প্রীতি দেখছি বাংলাদেশ ভারত উভয় দেশই বিভিন্ন বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এতে উভয় দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে অসম বাণিজ্য ঘাটতি ছিল এবং তা এখনো আছে।বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী ভারতকে যা দিয়েছি তা সারা জীবন মনে রাখবে। অপরদিকে ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তা, করিডোর, সীমান্ত হত্যা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ ইত্যাদি বিষয়ে ভারতের সাথে দ্বন্দ্ব রয়েছে।অস্বীকার করার উপায় নেই বিগত সময়ে এবং বর্তমান ভারত সরকার বাংলাদেশর জনগণের সাথে সম্পর্ক না করে একটি দলের সাথে সম্পর্ক করেছে ফলে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের ফাটল রয়েছে।
কূটনৈতিক সম্পর্ক হতে হবে দেশ টু দেশ এবং জনগণ টু জনগণ। তাছাড়া বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক গড়াই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। আশ্চর্য হই ফেসবুকে মানুষের আবেগ দেখে। এ জাতি কখনোই অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বিচার করে না। আপনারা যদি কখনো খেয়াল করেন সোশ্যাল মাধ্যমে জামায়াত বা এনসিপি বনাম বিএনপির কোন বিষয়ের একটি পুল করা হলে দেখবেন সেখানে জামায়াত বা এনসিপি বিএনপির চেয়ে এগিয়ে। যেখানে সারাদেশের ৩৫% এর বেশি ভোট বিএনপি’র সেই হিসেবে বিএনপি’র পাল্লা ভারী হবার কথা। কারণটা আপনারাই বের করেন। যেখানে এনসিপি এখনও নিবন্ধনভুক্ত দলই না। আর জামাতের কথা বাদই দিলাম। বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কার করি। ধরুন ছাত্রদল সভাপতি একটি পোস্ট দিল আর এনসিপির হাসনাত আব্দুল্লাহ বা তাসলিম জারা একটি পোস্ট দিল-পার্থক্যটা তখনই বুঝবেন। ছাত্রদলের একটি ইউনিটের যতগুলো কর্মী সমর্থক আছে এনসিপি এর সারাদেশেই তা নেই। তাহলে এত আবেগ কোথায় থেকে আসে।

আগেই বলেছিলাম সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। আদৌ কি তারা ফ্যাসিস্টের বিচার, সংস্কার এবং নির্বাচন দিবে নাকি ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার স্বপ্নে বিভোর। আগে বলা হতো আওয়ামী সরকার ইন্ডিয়া চালায়! তো বর্তমান সরকারকে কে চালায়? নাকি সরকারের ভিতর অদৃশ্য সরকার আছে? সেন্ট মার্টিন রোহিঙ্গা, করিডোর ইত্যাদি বিষয়ে জনগণের সন্দেহ আছে। আর সরকারও কোন বিষয় পরিষ্কার করছে না,যেটা আরও উদ্বেগের। জাতিসংঘ মহাসচিব এর সফরের পর ১,৮০,০০০ রোহিঙ্গা জান্তা সরকার ফেরত নিবে এ মর্মে সোশ্যাল মাধ্যমে যেভাবে রটানো হয়েছিল মনে হচ্ছে আগামী দিনে ডঃ ইউনুস আরেকটা নোবেল পাবেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এখনো পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়া হয়নি। বিনিময়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা প্রতিদিন বাংলাদেশের প্রবেশ করছে।

সম্প্রতি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে সেটা হল করিডোর বা মানবিক করিডোর। নির্বাচিত সরকার ছাড়া এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া সমীচীন নয়। এটার সাথে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জড়িত। তাছাড়া পার্বত্য অঞ্চলে কুকিচিনদের উত্থান গভীর উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশ এখন বিশ্ব মোড়লদের লোভনীয় খাবার। সবাই যার যার স্বার্থ হাসিল করতে চাচ্ছে। বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট মোড়ল দেশগুলো নিজেদের প্রয়োজনে বাংলাদেশকে ব্যাটল গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করতে চাচ্ছে। এ বিষয়ে সরকার, রাজনৈতিক দল এবং সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। সার্বভৌমত্বের সাথে সব পক্ষকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। তাছাড়া প্রচলিত আছে যে আমেরিকার ইন্ধনে মিয়ানমারের রাখাইন স্টেটে আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠনের তৎপরতা ইত্যাদি বিষয়গুলো কে খুবই ইন্টেলেকচুয়ালি হ্যান্ডেল করতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দর, তিস্তা প্রকল্প, লালমনিরহাট বিমানবন্দর ইত্যাদি বিষয়ে খুবই সতর্কতার সাথে এগোতে হবে। এরকম বিষয় ইন্টিরিয়ম গভর্মেন্টের সিদ্ধান্ত না নেয়াই যুক্তিযুক্ত। তাছাড়া সরকার নির্বাচন ইস্যুতে অগোছালো কথাবার্তা বলায় জনমনে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সন্দেহের দানা বেঁধেছে। এইজন্য বিএনপি সহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো দ্রুত নির্বাচন দেয়ার জন্য সরকারকে চাপ দিচ্ছে। বিদেশিদের ষড়যন্ত্রে পা দেয়া যাবেনা।

প্রফেসর ইউনূসের সরকার বিভিন্ন বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য ১১ টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিলেন। কমিশন নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে নারী সংস্কার বকমিশন, সংবিধান সংস্কার এবং নির্বাচন সংস্কার ইস্যুতে। সবগুলোকে মার্জ করে করা হয়েছে জাতীয় ঐক্যমত কমিশন। কমিশনের প্রস্তাবে এমন কিছু সুপারিশ করা হয়েছে যেগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ধর্মীয় অনুভূতি এবং সংস্কৃতির বিপক্ষে। অনেকেই মনে করছেন এসব সংস্কারের নামে পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে এবং LGBTQকে প্রমোট করা হচ্ছে বাংলাদেশে। এসব বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ।এমন কোন সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া যাবে না যেটা আমাদের ধর্ম এবং সংস্কৃতির পরিপন্থী। সংস্কার অবশ্যই আমাদের প্রয়োজন।তবে এ সংস্কার হতে হবে জনগণের চাওয়া পাওয়ার মধ্যে দিয়ে। বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা যাবে না।

এহেন পরিস্থিতির দ্রুত উত্তরণের জন্য সরকারের উচিত হবে যেসব বিষয়গুলোর মৌলিক সংস্কার না করলেই না, সেগুলো করা। ইতিমধ্যেই সরকার নির্বাচনের একটা সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছে, সরকারের উচিত হবে এ ঘোষিত তারিখের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় সব পক্ষের সাথে কাজ করা। সামগ্রিক দিক বিবেচনায় যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা যায়, ততোই তা দেশের জন্য মঙ্গলকর।।

আবারও বলতে চাই বাংলা মাটির সুসন্তান নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ইউনুস আপনি আশার বাতিঘর। আপনাকে হেরে যাওয়া যাবে না। আপনি হেরে গেলে বাংলাদেশ হেরে যাবে। দ্রুত জুলাই সনদ এবং নির্বাচনী রোড ম্যাপ প্রকাশ করুন। জানি আপনি পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাচ্ছেন না, আপনার পাশে দোসরদের প্রেতাত্তারা রয়েছে। তারপরেও আপনার হাতে সূচনা হোক ৫২, ৭১ এবং ২৪ এর চেতনায় উদ্ধৃত্ত হয়ে জাগরণ ঘটক নতুন বাংলাদেশের।

এ.এম. হেলাল
নির্বাহী পরিচালক
ইনস্টিটিউশন ফর স্যোশাইটাল গ্রোথ (ISG)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *