রাত ২:৩৫ শনিবার ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গ্রামীণ পরিবেশে গড়ে উঠেছে ‘বই পোকা’ পাঠাগার

গাজীপুর প্রতিনিধি :

শহর থেকে অটোতে চেপে খুব সহজেই কোলাহল মুক্ত গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশে বিল পোড়াহারার পাড়ে হাড়িনাল হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক মাধব চন্দ্র মন্ডল ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দে গড়ে তোলেন পাঠাগারটি।

গ্রামীণ পরিবেশে গড়ে ওঠা পাঠাগার তারপরেও শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হতে নানা বয়সের শিক্ষার্থীরা ছুটে আসেন এ পাঠাগারে। পাঠাগারটিতে প্রায় তিন হাজারের মতো বই রয়েছে। গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, কবিতা, গবেষণা গ্রন্থ সহ রয়েছে নানান রকমের ম্যাগজিন যেমন-কালি ও কলম, দেশ, উত্তরাধিকার, নব ভাবনা, কথার কাগজ, নতুন দিগন্ত, অনিন্দ্য, বিজ্ঞান, শিশু কিশোর মেলা, বিজ্ঞান চিন্তা, কিআলো,শব্দঘরসহ বিভিন্ন প্রকাশনার ঈদ সংখ্যা। উল্লেখ্য যে, পাঠাগার থেকে দুইমাস অন্তর অন্তর সাহিত্যের ভাঁজপত্র প্রকাশ করা হয়।
পাঠাগার থেকে বিভিন্ন জাতীয় দিবস, কবি সাহিত্যিকের জন্ম-মৃত্যু দিবস, গুণীজন সম্মাননা ও বছরে একদিন নৌকা ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। এছাড়াও পাঠাগারের কিছু নিয়মিত সদস্য নিয়ে ‘দরদী লোকগানের দল’ নামে গড়ে তোলা হয়েছে একটি গানের দল যার মাধ্যমে গ্রামের ছোট ছেলেমেয়েদের গান শেখানো হয়।
বইপোকা শাহরিয়ার শামীমের ভাষ্যমতে, আমি নগরীর ২৮ নং ওয়ার্ডের লক্ষ্মীপুরা বসবাস করি সেখান থেকে নিয়মিত এ পাঠাগারে আসি ও সাথে করে আরও পাঠক বিশেষ করে আমার শিক্ষার্থীদের বইপড়ার এ আন্দোলনে যুক্ত করতে নিয়ে আসি। নিয়মিত বই সংগ্রহ করেন পড়া শেষে জমা করেন। তিনি আরও বলেন যে, অবসর সময়ে বসে না থেকে একটি বই পড়লে তাঁর ভালো লাগে।

পাঠাগারটিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন পাঠ্যবই ও সহায়ক বই। রয়েছে বিশ্বিবদ্যালয়ে ভর্তি ও চাকুরী প্রত্যাশীদের জন্য বিশেষ বই।
কলেজ শিক্ষার্থী মোবারক হোসেন দিপু বলেন যে, আমি বাঙ্গালগাছ গ্রামে বসবাস করি সেখান থেকে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পাঠাগারে আসি। বিভিন্ন ধরনের বই বিশেষ করে হুমায়ুন আহমেদের বই পড়তে আমার ভালো লাগে। বইপড়ার পাশাপাশি আমি নিয়মিত এখানে গান শিখি ও গান করে থাকি।
এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে যে, এ পাঠাগারটি নিয়মিত যে সমস্ত কাজ করে যাচ্ছে সেগুলো সত্যি প্রশংসনীয়।
প্রমথ চৌধুরীর বইপড়া প্রবন্ধের কথা হয়তো আপনারা জানেন তিনি বলেছেন, “আমি লাইব্রেরিকে স্কুল-কলেজের ওপরে স্থান দিই এই কারণে যে, এ স্থলে লোকে স্বেচ্ছায় স্বচ্ছন্দচিত্তে স্বশিক্ষিত হবার সুযোগ পায়; প্রতিটি লোক তার স্বীয় শক্তি ও রুচি অনুসারে নিজের মনকে নিজের চেষ্টায় আত্মার রাজ্যে জ্ঞানের পথে এগিয়ে নিতে পারে। স্কুল কলেজ বর্তমানে আমাদের যে অপকার করছে সে অপকারের প্রতিকারের জন্য শুধু নগরে নগরে নয়, গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা কর্তব্য। আমি পূর্বেই বলেছি যে, লাইব্রেরি হাসপাতালের চাইতে কম উপকারী নয়, তার কারণ আমাদের শিক্ষার বর্তমান অবস্থায় লাইব্রেরি হচ্ছে একরকম মনের হাসপাতাল।”
আমি হাসপাতাল গড়ে তোলতে পারবো না যেখানে মানুষের দেহের নানা রোগের চিকিৎসা করা হয় কিন্তু আমি মনের হাসপাতাল গড়ে তুলেছি। যেখানে মানুষের মন সারিয়ে তোলা হয়।
পাঠাগার গড়ে তোলা প্রথমে সহজ বিষয় ছিলো না। নানান দিক থেকে বাঁধা এসেছে তারপরেও একান্ত চেষ্টায় সফল হয়েছি। সাধারণ মানুষ লাইব্রেরি শব্দটি শোনলেই মনে করে এটা বুঝি বই বিক্রির জায়গা এখানে যে বই বিক্রি হয় না সেটা বোঝাতেই অনেক সময় লেগেছে করতে হয়েছে অভিভাবক সমাবেশ। তবে বর্তমানে গাজীপুরের বিভিন্ন লেখকের বইসহ গ্রন্থিক প্রকাশনির কিছু বই পাঠাগারে রাখা হচ্ছে বিক্রির জন্য এখানে বইপোকা পাঠাগার পরিবেশক হিসেবে কাজ করছে।

পাঠাগারটি নিয়মিত মাধব চন্দ্র মন্ডল পরিচালনা করলেও উনার অনুপস্থিতে তাঁর বাবা-মা নতুবা ছোট ভাই উত্তম চন্দ্র মন্ডল পাঠাগারটির দেখাশোনা করে। বই উত্তোলনে সহায়তা করা ও জমা নেন।

বিগত কয়েক বছর আগে পাঠাগারটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক রেজিষ্ট্রেশন করা হয় যার ক্রমিক নং-০১৫।
লোকজনের সাথে কথা বলে একটি বিষয় জানা গেছে যে, পাঠাগারটি মূল রাস্তা থেকে একটু ভেতরে যেখানে যেতে পায়ে হাঁটার রাস্তা ছাড়া কোন রাস্তা নেই তাও আবার অন্য বাড়ির উপর দিয়ে যেতে হয়। বৃষ্টির দিনে পাঠাগারে আসা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এলাকাবাসী ও পাঠকদের জোর দাবী যে, কম করে হলেও যেনো ইট বিছানো একটি রাস্তা করে দেয়া হয় যাতে করে পাঠকরা সহজেই পাঠাগারে আসতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *