রাত ১১:৪২ রবিবার ৩১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাউখালির বেণুবন উওমানন্দ ধর্মবন বৌদ্ধ বিহারে পুণ্যময় কঠিন চীবর দান উৎসব অনুষ্ঠিত

রাঙামাটি প্রতিনিধি :

রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়াস্থ বেণুবন উওমানন্দ ধর্মবন বৌদ্ধ বিহারে ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর (১৯ কার্তিক) একটি ঐতিহ্যবাহী ও পুণ্যময় কঠিন চীবর দানোৎসব ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ব্যাপক উৎসাহ ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে। পার্বত্য রাঙামাটির এই বিহার প্রাঙ্গণ দিবসব্যাপী পূর্ণ হয়ে ওঠে পুণ্যার্থী ও স্থানীয় মানুষের উপস্থিতিতে, যা ধর্মীয় ঐক্য ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ স্থাপন করে।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই বিহারের প্রবেশ পথে স্থাপিত হয়েছিল প্রখ্যাত ধর্মগুরু উওমানন্দ মহাস্থবিরের স্মরণে নির্মিত এক চমৎকার তোরণ, যা দর্শনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে। সকালের সময় পুণ্যার্থীরা বুদ্ধের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে পঞ্চশীল গ্রহণ করেন, এরপর ধর্মসভায় অংশগ্রহণ ও কঠিন চীবর দানে অংশ নেন। কঠিন চীবর দান বৌদ্ধ ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ আচার, যা ধর্মীয় শুদ্ধতা, মানবকল্যাণ ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা রাখে।

দিনের প্রধান আকর্ষণ ছিল সংবর্ধনা ও আলোচনা সভা, যা পনসোনা বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ শ্রদ্ধেয় নাইন্দাবাসা মহাস্থবির-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বেতবুনিয়া কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ শ্রদ্ধেয় মঙ্গলারাম মহাস্থবির। আলোচনায় ধর্মীয় মূল্যবোধ, সমাজে সম্প্রীতি ও একাত্মতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা প্রদান করা হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাঙামাটি জেলা পৌর প্রশাসক মোহাম্মদ মোবারক হোসেন। সম্মানিত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বৌদ্ধ সংগঠন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বাবু নির্মল বড়ুয়া মিলন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির রাঙামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মিসেস জুই চাকমা, এবং বিএনপি কাউখালী উপজেলা কমিটির সহ-সভাপতি মি. পাইহিং মং মারমা। এছাড়াও, শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) মেকানিক্যাল বিভাগের প্রকৌশলী পবন বড়ুয়া নিশানকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে প্রবাসী বাবু বিপুল বড়ুয়া শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন এবং বেণুবন উওমানন্দ ধর্মবন বৌদ্ধ বিহারের সাধারণ সম্পাদক বাবু জীবন বড়ুয়া উদ্বোধনী বক্তব্যে কঠিন চীবর দানের ধর্মীয় তাৎপর্য তুলে ধরে সমাজে শান্তি ও মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। বক্তারা সবাইকে একত্রিত হয়ে সমাজে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে কাজ করার গুরুত্বের উপর জোর দেন।

এই দানোৎসবের মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রসারে অবদান রাখার পাশাপাশি পার্বত্য এলাকার ধর্মীয় ও সামাজিক ঐক্য আরও দৃঢ় হয়েছে। বিহার কর্তৃপক্ষের কঠোর তত্ত্বাবধানে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, যা এলাকার ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও স্মরণীয় দিন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

জানা গেছে, চলতি বছরের ৭ অক্টোবর থেকে রাঙামাটিতে শুরু হওয়া শুভ কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানটি এই কাউখালীর বেণুবন উওমানন্দ ধর্মবন বৌদ্ধ বিহারের দানোৎসবের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্তি লাভ করে। এই মাসব্যাপী ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ধর্মীয় সংহতি ও সামাজিক বন্ধনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

কঠিন চীবর দানোৎসব শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার নয়, এটি পার্বত্য রাঙামাটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই উৎসব মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি এবং মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে। বিশেষ করে বর্তমান সামাজিক বিভাজন ও অস্থিরতার সময়ে ধর্মীয় ঐক্যের এই ধরনের অনুষ্ঠান সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্থানীয় ও পুণ্যার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ এই উৎসবের তাৎপর্যকে আরও বর্ধিত করেছে।

সার্বিকভাবে, এই দানোৎসব বৌদ্ধ ধর্মের প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শিক্ষার সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। এটি স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধন মজবুত করার মাধ্যমে পার্বত্য এলাকার স্থায়ী উন্নয়নে অবদান রাখবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *