
অনলাইন ডেস্ক :
নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সফরসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেনের ওপর ডিম নিক্ষেপের ঘটনায় বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের যুক্তরাষ্ট্র শাখার নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা উঠেছে। এ ঘটনার পর সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেন ফেসবুকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, “আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করার ফল আজকে নিউইয়র্কের বিমানবন্দরের মাইর।”
ঘটনার বিবরণ
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে যোগ দিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাত ১টার দিকে জেএফকে বিমানবন্দরের ৮ নম্বর টার্মিনালে পৌঁছান। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিমানবন্দরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেন। তারা ‘জয় বাংলা’, ‘রাজাকার’, ‘টের পাইছে’সহ অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করেন এবং আখতার হোসেন ও এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারাকে লক্ষ্য করে কয়েক দফা ডিম ছুড়ে মারেন। ডিম আখতার হোসেনের শরীরে আঘাত করে।
একই সময় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ড. ইউনূস ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে স্বাগত জানাতে আনন্দ সমাবেশ করেন। উভয় দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করে। বিমানবন্দরের টার্মিনাল এলাকা পক্ষে-বিপক্ষে শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। উভয় পক্ষের হাতে ছিল নানা রঙের ব্যানার ও ফেস্টুন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবিরসহ অন্যান্য নেতারা। ঘটনার পর জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা আখতার হোসেন ও তার সঙ্গীদের নিরাপদে গাড়িতে তুলে সরিয়ে নেন।
ইলিয়াস হোসেনের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেন ফেসবুকে এক পোস্টে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, “আওয়ামী লীগকে আজকের পারফর্মেন্সের জন্য ধন্যবাদ। চোরেরা যেখানে সেখানেই এভাবে লাথি খাবে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করার ফল আজকে নিউইয়র্কের বিমানবন্দরের মাইর।” তার এই পোস্ট সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পুলিশের ব্যবস্থা
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাহিনী ও নিউইয়র্ক পুলিশ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশ-বিদেশে নিন্দার ঝড় ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ কর্মী মিজানকে শনাক্ত করে এবং জ্যাকসন হাইটস এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। পুলিশ জানিয়েছে, মিজানের বিরুদ্ধে জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ ও আক্রমণমূলক আচরণের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। অতিরিক্ত অভিযোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
এনসিপি ও বিএনপি নেতারা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা এটিকে কেবল আখতার হোসেনের ওপর নয়, পুরো প্রতিনিধি দলের ওপর সংগঠিত রাজনৈতিক হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিএনপির এক বিবৃতিতে বলা হয়, “এ ধরনের হিংসাত্মক আচরণ আওয়ামী লীগের অসহিষ্ণুতা ও ভিন্নমত দমনের মানসিকতার প্রকাশ।” জামায়াতে ইসলামীও এ ঘটনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছে।
ড. ইউনূসের সফর ও উত্তেজনা
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিনিধি দল ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন। তার সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষ নেতারা। এই সফরকে ঘিরে নিউইয়র্কে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিএনপি ও এনসিপির নেতাকর্মীরা যেখানে ড. ইউনূসকে স্বাগত জানিয়েছে, সেখানে আওয়ামী লীগ বিমানবন্দর থেকে হোটেল পর্যন্ত বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে।
জনমত ও প্রভাব
এ ঘটনা প্রবাসী বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে অনেকে এই হামলাকে ‘লজ্জাজনক’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভক্তির প্রবাসে প্রভাব ফেলছে, যা আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর।নিউইয়র্ক পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি শান্ত রাখতে বিমানবন্দর ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে।