
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি :
বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছে। একদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া, পানি ও বায়ু দূষণ এবং মানবদেহে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে চলেছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কৃষি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় আয়োজন করা হয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ কৃষক কর্মশালা, যেখানে জৈব পদ্ধতির কৃষিকে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।
মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল আন্দুলবাড়িয়া এলাকায় ব্র্যাক সিড অ্যান্ড অ্যাগ্রো এন্টারপ্রাইজের উদ্যোগে আয়োজিত এই একদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের মূল বিষয় ছিল—কীভাবে জৈব-বালাইনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিকে টেকসই করা যায়, পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখা যায় এবং একই সাথে মানুষের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিমুক্ত রাখা যায়। কর্মশালায় স্থানীয় কৃষক, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা, বীজ ব্যবসায়ী ও সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন এবং নিজ নিজ অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরেন।
কর্মশালায় বক্তারা শুরুতেই বর্তমান প্রচলিত কৃষি পদ্ধতির নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেন। তারা বলেন, গত কয়েক দশক ধরে ফসলের উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর লক্ষ্যে কৃষকরা অতিরিক্ত পরিমাণে রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করছেন। প্রাথমিকভাবে এতে ফলন বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব অত্যন্ত ক্ষতিকর। মাটির ভেতরের প্রাকৃতিক পুষ্টি উপাদান ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ফলে একই জমিতে আগের মতো উৎপাদন পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া কৃষি কাজে ব্যবহৃত পানির উৎসগুলোও রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণে দূষিত হচ্ছে, যা পানি ব্যবহারকারী প্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বিপদ ডেকে আনছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, রাসায়নিক মিশ্রিত খাদ্যদ্রব্য গ্রহণের ফলে মানবদেহে ক্যান্সার, হৃদরোগ, কিডনি ও লিভারের সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিল রোগের প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা এই ক্ষতিকর প্রভাবের বেশি শিকার হচ্ছেন। এছাড়া রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের ওপর। উপকারী পোকামাকড় ও জীবাণু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় প্রকৃতির নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এই সমস্যাগুলোর সমাধান হিসেবে বক্তারা জৈব-বালাইনাশককে সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেন। তাদের মতে, জৈব পদ্ধতিতে তৈরি এই বালাইনাশকগুলো প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি হওয়ায় এগুলো মাটি ও পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না। এগুলো ব্যবহারের ফলে মাটির উর্বরতা বজায় থাকে, ফসলের গুণমান ভালো হয় এবং উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্য সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ হয়। দীর্ঘমেয়াদে এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে কৃষি কাজকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এর সুফল ভোগ করতে পারবে।
অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন আন্দুলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাবিবুর রহমান। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, “আমাদের এলাকার বেশিরভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তারা সঠিক তথ্য ও প্রশিক্ষণের অভাবে ক্ষতিকর পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। এই কর্মশালাটি সেই শূন্যস্থান পূরণ করার একটি বড় প্রচেষ্টা। আমি ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, এ ধরনের কার্যক্রমকে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করব এবং কৃষকদের সচেতন করার কাজে অংশ নেব।”
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন। তিনি কৃষকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “কৃষিকে টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা অপরিহার্য। রাসায়নিক নির্ভরতা কমিয়ে জৈব পদ্ধতি গ্রহণ করলে শুধু আমাদের নয়, পুরো জাতি উপকৃত হবে। বর্তমান বিশ্ববাজারেও নিরাপদ ও জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত ফসলের চাহিদা বাড়ছে, ফলে এই পদ্ধতি গ্রহণ করলে কৃষকরা আর্থিকভাবেও লাভবান হবেন। ব্র্যাক সিডের মতো প্রতিষ্ঠান যখন এ ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছেন, তখন আমাদের সকলের উচিত এগুলোকে স্বাগত জানানো ও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা।”
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলের রিজিওনাল সেলস ম্যানেজার মো. আক্তারুল ইসলাম। তিনি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানান, কৃষি উন্নয়ন ও কৃষকদের জীবনমান উন্নয়ন করা তাদের মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তারা নিয়মিত এ ধরনের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত রাখবেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানটি কৃষকদের জন্য উন্নতমানের বীজ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করছেন এবং সঠিক ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করছেন।
জৈব-বালাইনাশকের ব্যবহারের পাশাপাশি কর্মশালায় ব্র্যাক উদ্ভাবিত বিভিন্ন উন্নতমানের ফসলের জাত সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এই জাতগুলো গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে, যা সাধারণ জাতের তুলনায় বেশি ফলনশীল, রোগ-পোকার আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা রাখে এবং পরিবেশের বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।
আলোচিত প্রধান জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে—হাইব্রিড ধান ‘রাজা’, যা কম জমিতেও বেশি উৎপাদন দেয় এবং পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ; করলা বীজ ‘মনি’, যা বেশি পরিমাণে ফল উৎপাদন করে ও বাজারে বেশি চাহিদা রয়েছে; চিচিঙ্গা ‘চাঁদনী’, যা আকারে বড় ও গুণমানে উন্নত; এবং উন্নতমানের আলু বীজ, যা সংরক্ষণে সহজ ও দীর্ঘদিন ভালো থাকে।
বক্তারা এই বীজগুলোর বৈশিষ্ট্য, চাষের উপযুক্ত মৌসুম, মাটি প্রস্তুত করার নিয়ম, বপন পদ্ধতি, পরিচর্যার বিভিন্ন ধাপ এবং ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন। তারা জানান, এই উন্নত জাতগুলো জৈব পদ্ধতির সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় এগুলো চাষ করলে একদিকে যেমন উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে ফসলের গুণমানও উন্নত হবে। ফলে কৃষকরা বাজারে তাদের ফসলের ভালো মূল্য পাবেন এবং তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে।
কর্মশালায় স্থানীয় বীজ ব্যবসায়ী ও ডিলাররাও উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মেসার্স ভাই ভাই বীজ ভান্ডারের প্রোপ্রাইটর মো. আব্দুল খালেক, সংগ্রাম বীজ ভান্ডার ট্রেডার্স-এর প্রোপ্রাইটর মো. আব্দুল আলিম, মনির বীজ ভান্ডারের প্রোপ্রাইটর মো. মহিউদ্দিন, কনিকা বীজ ভান্ডারের প্রোপ্রাইটর মো. উমর আলী এবং ভালাইপুর, চুয়াডাঙ্গার ডিলার মো. আব্দুল মতিন। তারা বলেন, কৃষকরা যাতে সহজে ও ন্যায্য মূল্যে উন্নতমানের বীজ ও জৈব উপকরণ পান, সে বিষয়ে তারা সর্বদা সচেষ্ট থাকবেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান করবেন।
অনুষ্ঠানটির সফল আয়োজন ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার কাজটি পরিচালনা করেন মো. জাকির হোসেন (টিএসও, ঝিনাইদহ-১), মো. রহিজুল ইসলাম (পিডিএস, চুয়াডাঙ্গা) এবং মো. গোলাম কিবরিয়া (টিএসও, চুয়াডাঙ্গা)। তাদের কঠোর পরিশ্রম ও নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই কর্মশালাটি সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়।
এই কর্মশালায় আন্দুলবাড়িয়া, জীবননগর ও চুয়াডাঙ্গা এলাকার মোট ৫৫ জন মডেল কৃষক অংশগ্রহণ করেন। এখানে শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান প্রদান করা হয়নি, বরং বাস্তব ক্ষেত্রে কীভাবে এই পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করতে হয় সে বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের জৈব-বালাইনাশকের প্রকৃতি, উপাদান, কার্যকারিতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়। সাথে সাথে বিভিন্ন ফসলের বিভিন্ন রোগ ও পোকার আক্রমণ চিহ্নিত করার পদ্ধতি, সেগুলোর ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় এবং সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে জৈব-বালাইনাশক প্রয়োগ করার নিয়মও তাদের শেখানো হয়।