রাত ৮:৪১ রবিবার ৩১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্রেন ফগ কি? এই রোগ থেকে পরিত্রাণের উপায়

ব্রেন ফগ কি?এই রোগ থেকে পরিত্রানের কি উপায়।
মাহমুদা নাজনীন
ক্লিনিক্যাল ডাইটেশিয়ান কনসালটেন্ট সেন্ট্রাল হাস্পাতাল ধানমন্ডি ঢাকা।

“ব্রেন ফগ” (Brain Fog) বা বাংলায় বলতে পারি “মস্তিষ্কের কুয়াশা” একটি চিকিৎসাগত নাম নয়, বরং মস্তিষ্কের কাজের স্বাভাবিক গতি, সতর্কতা, মনোসংযোগ, স্মৃতি ও ভাবনা করা‐ক্ষমতায় ধীরতা বা ধন্দাবিহীন অবস্থা বোঝায়।
ব্রেন ফগের সময় মানুষ অনুভব করতে পারে:

মনোসংযোগ ধরে রাখা যায় না, খুব দ্রুত বিভ্রান্ত হয়।

চিন্তা ধীরে চলে যায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সমস্যা হয়।

স্মৃতিতে গড়িয়ে গেছে ছোট বড় জিনিস ভুলে যাওয়া, কথা বা নাম মনে রাখতে অসুবিধা।

মানসিক ক্লান্তি বেড়ে যায়; মাথা ভারী, ঝিমঝিম ভাব।

ডায়রেক্ট “তাজা ভাবনায় কাজ করতে পারি না” এমন অনুভূতি – যেন সবকিছু কুয়াশার পর্দার মধ্যে থেকে দেখা যায়।

**** কেন হয়? — ব্রেন ফগের সম্ভাব্য কারণগুলি :

ব্রেন ফগ হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই; সাধারণত একাধিক ফ্যাক্টর মিলিত হয়ে এই অবস্থা তৈরি করে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারণ নিচে আলোচনা করা হলো :

ঘুমের অভাব বা ঘুমের গুণগত মান কম থাকা
ঘুম মস্তিষ্কে “রিস্টোরেশন” ও মেমোরি কনসলিডেশন‐এর জন্য জরুরি। নিত্যনৈমিত্তিক ঘুম কম হলে মস্তিষ্ক যথেষ্ট সময় পাচ্ছে না নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করতে।

খাওয়া‐দাওয়া ও পুষ্টি‐শূন্যতা
উদাহরণস্বরূপ, প্রয়োজনীয় ভিটামিন (বিশেষ করে বি ভিটামিন, ভিটামিন D), মিনারেলস (যেমন আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম) কম হলে বা পরিমিত প্রোটিন সহ শর্করা ও স্বাস্থ্যকর চর্বি কম হলে মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না।

ডিহাইড্রেশন (পানি কম খাওয়া)
শরীর ও মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ করার জন্য পানি প্রয়োজন, পানির অভাবে অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক প্রক্রিয়া, রক্তের ঘনত্ব পরিবর্তন হয় এবং মনোসংযোগ ব্যাহত হতে পারে।

স্ট্রেস, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ
দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রেস থাকলে কর্টিসলসহ বিভিন্ন হরমোনের পরিবর্তন ঘটতে পারে, যা মনঃসংযোগ ও স্মৃতিতে প্রভাব ফেলে।

আনন্দ‐দায়ক শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভাব
নিয়মিত ব্যায়াম রক্ত সঞ্চালন, মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায়। শারীরিকভাবে সক্রিয় না থাকলে, মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে ক্লান্ত ও মনোযোগ কমে যায়।

ডিজিটাল/স্ক্রিনের অতিরিক্ত ব্যবহার
স্মার্টফোন, কম্পিউটার, টিভি স্ক্রিন দীর্ঘক্ষণ দেখলে চোখের ক্লান্তি, ঘুম বিঘ্নিত হওয়া ও মনোসংযোগে বিঘ্ন ঘটতে পারে।

হরমোনাল পরিবর্তন ও চিকিৎসাগত অবস্থা
যেমন থাইরয়েড বন্ধ বা অতিরিক্ত কার্যকারিতা, ডায়াবেটিস, chronic fatigue syndrome, autoimmune রোগ, বিষক্রিয়া, নিউরোলজিক্যাল সমস্যা ইত্যাদি।

ভাইরাল সংক্রমণ বা দীর্ঘমেয়াদী রোগ
উদাহরণস্বরূপ কোভিড‐১৯-এর পর “Long COVID” রোগীদের মধ্যে অনেকেই ব্রেন ফগের সমস্যা বর্ণনা করেছেন।

**** এর থেকে পরিত্রানের উপায়

ব্রেন ফগকে পুরোপুরি দূর করতে নাও পারলেও অনেক বেশি উন্নতি এনে দেওয়া যায়। নিচে কিছু কার্যকর উপায় দেওয়া হলো:

গুণগত ও পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা

প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ওঠার অভ্যাস গঠন করতে হবে।

ঘুমের পূর্বে স্ক্রিন (মোবাইল, কম্পিউটার, টিভি) থেকে দূরে থাকা; ব্লু‐লাইট কমিয়ে আনা; ঘুমানোর ঘর অন্ধকার ও শান্ত রাখা।

ঘুমের সময় ৭–৯ ঘণ্টার মধ্যে রাখা; গুণগত ঘুম খারাপ হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস গঠন করা

ফলমূল, সবজি, বাদাম, স্বাস্থ্যকর চর্বি (যেমন ওমেগা‐৩) বেশি খাওয়া।

হেলদি প্রোটিনের উৎস (মাছ, মুরগি, ডাল‐পাল) রাখা; অত্যধিক তেল ও চিনি কমিয়ে আনা।

রক্ত‐শর্করা (blood sugar) নিয়ন্ত্রণে রাখা; বড়‐বড় ফাস্ট ফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া।
পর্যাপ্ত পানি পান করা।
নিয়মিত ব্যায়াম ও শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ানো
প্রতিদিন কিছুটা চলাফেরা, দ্রুত হাঁটা, সাইক্লিং বা হালকা জগিং – এসবই কার্যকর।

যোগ, পাইলেটস বা জিমের ব্যায়াম – স্ট্রেস কমায়, মনোসংযোগ বাড়ায়।
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমানো

ধ্যান (meditation), গভীর শ্বাস‐প্রশ্বাসের অনুশীলন, মাইন্ডফুলনেস বাবা বিষয়গুলোর অভ্যাস গঠন করা।

কাজের বিরতি নিন; ভারসাম্য বজায় রাখুন কাজ ও বিশ্রামের মধ্যে।

পারিবারিক ও সামাজিক সমর্থন পাওয়া চেষ্টা করা; কথা বলা ও অনুভূতি ভাগাভাগি করা।

স্ক্রিন টাইম ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ

দিনের মধ্যে স্ক্রিন থেকে বিরতি নিন; প্রতি ৩০–৬০ মিনিট পর একটি বিরতি—চোখ মুছতে, একটু হাঁটতে বা বাইরে একটু বের হতে।

মোবাইল/কম্পিউটার ব্যবহারের আগে ও পরে চোখের ক্লান্তি কমিয়ে আনার পদ্ধতি যেমন ব্লু‐লাইট চোখে ব্লকার বা সেটিংস কমিয়ে নেওয়া।

মস্তিষ্ক সচল রাখা (Mental stimulation)

নতুন কিছু শেখা: ভাষা, বাদ্যযন্ত্র, হবি‐পছন্দের কিছু – যা মনকে নতুনভাবে কাজ করতে বাধ্য করে।

ধাঁধাঁ, শব্দ‐খেলা, পাজল, শ্রুতিমধুর গান আদি যেসব কাজ মনকে বিশ্রাম দেয় না, তবে সৃষ্টিশীলভাবে ঝোঁক দেয়, সেসব কাজ করা।

স্বাস্থ্যগত অবস্থা যাচাই করা

যদি দীর্ঘদিন এই অবস্থা বজায় থাকে, ডাক্তারের কাছে গিয়ে রক্ত পরীক্ষাসহ সাধারণ চেক‐আপ করানো। কারণ থাইরয়েড, ডায়াবেটিস, আয়রন বা ভিটামিন ডি এর ঘাটতি, হরমোনের সমস্যা সব কিছু মস্তিষ্কের কাজের ওপর প্রভাব ফেলে।

যদি কোনও দীর্ঘমেয়াদী রোগ বা চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে, সেটাও বিবেচনায় আনতে হবে।

অতিরিক্ত ক্যাফেইন, এলকোহল ও ধূমপান কমিয়ে আনা

ক্যাফেইন ও এলকোহল ঘুম ও মস্তিষ্কের বিশ্রামের র‍্যুটিন বিঘ্নিত করতে পারে।

ধূমপান ও অন্য কোনো টক্সিনের (বিষক্রিয়ার) অভ্যেস কমানো জরুরি।

পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও “ব্রেক” নেওয়া

অনেকক্ষণ একটানা কাজ করার পর মন ও শরীর দুইটাই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কাজের মাঝে ছোট‐ছোট বিরতি নিন (বিভিন্ন কাজের ধরণ ও সময় বিবেচনায়)।

অফিসে বা পড়াশোনায় কাজের ভার ভাগ করা; হালকা কাজ বা বিশ্রামসূচক কাজ মাঝে মাঝে নেওয়া।

স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও জীবনযাপন:

ধ্যান‐যোগ, নির্ঘুমতা কমিয়ে আনা, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো; বাইরের হাওয়া ও আলো পাওয়া; মন ভালো রাখতে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখাঃ এগুলো সব “মেন্টাল রেসিলিয়েন্স” তৈরি করে।

সঠিক নিউরোপসাইকোলজিক্যাল সুপরামর্শ পাওয়া যেমন কাউন্সেলিং বা থেরাপি প্রয়োজন হলে।

কিছু দ্রুত কাজ করা টিপস

এখনই যদি কিছু দ্রুত পরিবর্তন চান, যা বেশি সময় লাগবে না, তাহলে নিচের কাজগুলো করতে পারেন:

সকালে উঠে একটু হাঁটাহাঁটি করুন বা হালকা ব্যায়াম করুন – রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় ও মন সতেজ হয়।

কাজ শুরু করার আগে একটি পরিষ্কার‐সংস্কার টু‐ডু তালিকা তৈরি করুন, অগ্রাধিকার নির্ধারণ করুন।

কাজের সময় মোবাইল ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বিরতি নিন।

চোখ ক্লান্ত হলে প্রতি ২০–৩০ মিনিটে কিছু সময় চোখ বন্ধ করে একটু ঘোরাঘুরি করুন।

একটি গ্লাস পানি পান করে রাখুন চারপাশে, নিয়মিত পানির অভ্যাস রাখুন।

পরিবেশে কিছু পরিবর্তন আনুন – ঘর পরিষ্কার, আলো ভালো, বাতাস চলাচল ঠিকঠাক।

সতর্কতা ও কখন বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত

ব্রেন ফগ যদি স্বাভাবিকভাবে lifestyle পরিবর্তন ও বিশ্রামের মাধ্যমে কিছুদিনে ঠিক না হয় বা সময়ের সাথে বাড়তে থাকে, তবে নীচের বিষয়গুলো দেখা জরুরি:

যদি স্মৃতি ও মনোযোগের সমস্যা এত বেশি হয় যে কাজ/বিদ্যালয়/দপ্তর জীবন বিপর্যস্ত হয়।

যদি ঘুমের সমস্যাগুলো দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকে।

যদি নির্দিষ্ট রোগ (যেমন থাইরয়েড সমস্যা, ডায়াবেটিস, অটোইমিউন রোগ) থাকলেও তার চিকিৎসা সচল না হয়।

যদি মেজাজ বিকাশ, অবসাদ (ডিপ্রেশন), উদ্বেগ নিয়ে সমস্যা হয়।

যদি কোনও নতুন ও দ্রুত বাড়তে থাকা শারীরিক উপসর্গ থাকে, যেমন অস্থির শ্বাস, ধমক শব্দ, চেতনা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া, বা সংক্রমণের লক্ষণ ইত্যাদি।

উপসংহার :

ব্রেন ফগ একটি স্বাভাবিক মানসিক অবস্থা, কিন্তু যখন এটি ঘন ঘন হয় বা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন জীবনযাপন ও কাজ‐পড়ায় ধীরগতি ও ভুল‐ভ্রান্তির সম্ভাবনা বাড়ে। তবে বিষয়টি ভয় করার মতো নয় –লাইফ স্টাইল পরিবর্তন, স্বাস্থ্যকর খাদ্য ও ঘুম, মানসিক ঝঞ্ঝাট কমিয়ে আনা এবং নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে ব্যাপক উন্নতি সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *