সন্ধ্যা ৬:২৩ সোমবার ২৭শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঈশ্বরদীতে শত শত হেক্টর শিমের জমিতে ভাইরাসের আক্রমন, কৃষকের সর্বনাশ

ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি :

দেশের শিমের রাজ্যে হিসেবে পরিচিত পাবনার ঈশ্বরদীতে প্রায় ৩০ বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে শিমের আবাদ হয়ে আসছে। শিম সাধারণত শীতকালীন সবজি হলেও এ উপজেলার কৃষকরা এক যুগ ধরে আগাম শিমের আবাদ করছেন। এতে চাষিরা প্রতিবছরই ভালো লাভবান হচ্ছেন। এবার অতিবৃষ্টির কারণে শিমের জমিতে হলুদ মোজাইক নামে একধরনের ভাইরাস আক্রমণ করেছে। এছাড়াও সাদা মাছি ও জাব পোকা শিম ক্ষেত নষ্ট করছে। এতে আগাম শিম চাষ করে লাভবান হওয়ার স্বপ্ন ধূসর হতে চলেছে চাষিদের।

জানা যায়, আষাঢ় মাসে আগাম শিমের আবাদ শুরু হয়। এবার শিম চাষের শুরুতেই দফায় দফায় ‍বৃষ্টির মুখে পড়ে চাষিরা। ফলে বেশিরভাগ শিমের জমিতে পানি জমে যায়। অতিবৃষ্টির কারণে শিম গাছের গোড়া দূর্বল হয়ে পড়ায় ভাইরাস আক্রমণ করে। এতে গাছের গোড়ায় পঁচন ধরে। এছাড়াও গাছের পাতা বাদামী ও হলুদ বর্ণ ধারণ করে পাতা ঝরে পরছে এবং শিমের লতা-ডগা কুঁকড়ে যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে চাষিরা কুঁকড়ে যাওয়া শিমের লতা, পাতা ও ডগা কেটে দিচ্ছে। অধিকাংশ আগাম শিমের জমিতে এখন ফুল ফুটেছে। কিছু কিছু জমিতে শিমের ফলন শুরু হয়েছে। অতিবৃষ্টিপাতের কারণে শিমের ফুল ঝরে যাচ্ছে। বিরূপ আবহাওয়ায় ভাইরাস ও ছত্রাকের আক্রমণে  কীটনাশক ব্যবহার করেও সুফল মিলছে না। শ্রাবণের শেষ সপ্তাহে আগাম শিম বাজারে বিক্রি শুরু হয়েছে। এবার বিরূপ আবহাওয়ার কারণে শিমের ফলন বিপযয় দেখা দেওয়ায় এখন প্রতি বিঘায় ৮-১০ কেজি শিম উঠছে। অথচ অন্যান্য বছর এসময় প্রতি বিঘা জমি থেকে প্রতিদিন ৩০-৪০ কেজি শিম তুলা যেত।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, ঈশ্বরদীতে এবার শিম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে ১২৯০ হেক্টর জমি। এরমধ্যে আগাম জাতের অটোশিমের আবাদ হয়েছে ৮৯০ হেক্টর জমিতে।সরেজমিনে, উপজেলার আগাম শিম চাষের গ্রাম খ্যাত রামনাথপুর, বেতবাড়িয়া, শেখপাড়া, মুলাডুলি, ফরিদপুর, বাঘহাছলা, সরাইকান্দি, আটঘরিয়া ও শ্রীপুর এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, আগাম জাতের বেশিরভাগ শিমক্ষেত ফুলে ফুলে ভরে গেছে। ফুলের মাঝে মাঝে শিম ঝুলে আছে। তবে অন্যবারের তুলনায় এবার শিমের ফলন খুব কম চোখে পড়েছে। কৃষকরা কেউ গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত আবার কেউ শিম তোলায় ব্যস্ত। এসবের মাঝে কৃষকদের সবচেয়ে বড় দুর্শ্চিতা শিমে ভাইরাস ও ছাত্রকের আক্রমন। এতে ফলন কম হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাঘহাছলা গ্রামের চাষি মফিজ উদ্দিন শেখ বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে শিমক্ষেতে ভাইরাস ও ছত্রাক আক্রমণ করেছে। শিমের ডগা, লতা কুঁকুড়ে ও পাতা শুকিয়ে যাচ্ছে। এ ভাইরাসের জন্য আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। ওষুধ কোম্পানীর ডিলারদের কাছে গেলে তারা নানান ধরনের কীটনাশক দেয় এতে খুব বেশি কাজ হয় না। আমরা এর প্রতিকার চাই।

রামনাথপুর গ্রামের কৃষক রায়হান আলী শিমের জমি ভাইরাস থেকে রক্ষা করতে কীটনাশক স্প্রে করছিলেন। এসময় তিনি বলেন,এবার অতিবৃষ্টির কারণে আগাম শিমের জমিতে ভাইরাস আক্রমণ করেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত গাছের লতা কুঁকড়ে যাচ্ছে ও পাতা হলুদ হয়ে যাচ্ছে। এ ভাইরাস থেকে শিম গাছ বাঁচাতে কীটনাশক স্প্রে শুরু করেছি। এতেও খুব বেশি সুফল মিলছে না। এবার শিমের কি যে হবে বুঝে উঠতে পাচ্ছি না।বাঘহাছলা গ্রামের চাষি হাবিবুর রহমান বলেন, শিমের জমিতে যে রোগ দেখা দিয়েছে এতে ফলন কম হবে এবং একটা সময় এ শিম বিক্রি করা কঠিন হয়ে যাবে। এ রোগের কারণে পাতা হলুদ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন গাছের লতা ও পাতা কেটে ফেলে দিতে হচ্ছে। একই গ্রামের কৃষাণী সূর্যবান বলেন, এক বিঘা জমিতে শিমের আবাদ করেছি। জমি জুড়ে ভাইরাস আক্রমণ করেছে। প্রতিদিন সকালে এসে হলুদ এবং কুঁকড়ে যাওয়া লতা, পাতা ও ডগা ছিড়ে ফেলে দিতে হচ্ছে। এতে ফলন কমে যাবে। সার ও কীটনাশকের খরচও বাড়ছে।

উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নের সরাইকান্দি ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রুমানা পারভীন বলেন, এ ব্লকে প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে শিমের আবাদ হয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে কৃষকরা সময়মত শিম গাছের পরিচর্যা করতে পারেনি। যার কারণে শিম গাছ কম বেড়েছে। কিছু গাছে ভাইরাস দেখা যাচ্ছে। এতে কৃষকদের শংকিত হওয়ার কোন কারণ নেই। সাদা মাছি ও জাব পোকার কীটনাশক স্প্রে করলে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সে গাছ প্রয়োজনে উপড়ে ফেলতে হবে। অথবা কোন ডগা ও পাতায় আক্রমণ করলে তা কেটে ফেলতে হবে। এখন পযন্ত শিম  যে অবস্থা দেখছি তাতে কৃষকরা তাদের কাঙ্খিত ফসল পাবে।

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মমিন বলেন, ঈশ্বরদী উপজেলায় ৮৯০ হেক্টর জমিতে আগাম শীমের আবাদ হয়েছে। ইতিমধ্যে শিম হারবেষ্ট শুরু হয়ে গেছে। অতিবৃষ্টির কারণে কৃষকের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বৃষ্টি থেমে গেলে কৃষক আরো লাভবান হবে বলে আশা করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *