দুপুর ২:৪৬ সোমবার ২৭শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শাসন এবং সুশাসন : বাংলাদেশের বাস্তবতা ও সম্ভাবনা : আবুল মনসুর হেলাল

শাসন এবং সুশাসনঃ বাংলাদেশের বাস্তবতা ও সম্ভাবনা

শাসন (Governance) ও সুশাসন (Good Governance) এই দুটি শব্দ, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় খুবই অপরিহার্য। যে সমস্ত দেশে যথাযথ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত আছে সুশাসন সেসব দেশের নাগরিকরা উপভোগ করছে। শাসন মানে কেবল ক্ষমতার প্রয়োগ নয়, বরং জনগণের প্রতি দায়িত্ব, জবাবদিহিতার সমন্বিত একটি কাঠামো।
Governance is the manner in which power is exercised in the management of a countries economic and social resource for development. (World bank 1991)
অপরদিকে সুশাসন হল ন্যায়, জবাবদিহিতা, অংশগ্রহণ ,স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা।
Good governance is a perhaps the single most important factor in eradicating poverty and promoting development. (kofi Anan, Former UN Secretary General).
বাংলাদেশ নামক উন্নয়নশীল রাষ্ট্রটি বিভিন্ন সম্ভাবনায় এগিয়ে থাকলে ও শাসন এবং সুশাসনের ঘাটতি জাতীয় অগ্রগতির এক বড় বাধা। এই প্রেক্ষাপটে, আমাদের প্রয়োজন শাসন ও সুশাসনের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক চিত্র একবার নতুনভাবে ভেবে দেখা।
বাংলাদেশে শাসনের রুপ রেখা এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা ও কাঠামোগত সংকট:
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। হাজারো সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র শাসন এবং সুশাসনের অভাবে বাংলাদেশের কাংখিত উন্নয়ন সম্ভব হয়নি। যার দরুন এই দেশে বিভিন্ন সমস্যা বিরাজমান। বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা মূলত কেন্দ্রীভূত এবং আমলা নির্ভর। যেখানে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক স্তর গুলোতে নিয়ম-নীতি, নির্দেশিকা ও পরিকল্পনা কাগজে-কলমে সুসজ্জিত ভাবে বিদ্যমান। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেখানে দেখা যায় দলীয় প্রভাব অকার্যকর তদারকি এবং কার্যকর জবাবদিহিতার অভাব। নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানত কেন্দ্রের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো রয়ে গেছে প্রায় ক্ষমতাবাবিহীন। তারা কেন্দ্রের নির্দেশনা বাস্তবায়নের বাহক হলেও নিজস্ব পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা পায় না। ফলে মাঠপর্যায়ের নীতিমালার প্রভাব সীমিত এবং জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী তা বাস্তবায়িত হয় না। সেবাদান মূলক প্রশাসন রূপ নেয় নিয়ন্ত্রণ মূলক শাসনে, যেখানে প্রাধান্য পায় “ফাইল অনুমোদিত” “তদবির” বা “চাপ” অথচ পিছিয়ে থাকে জনসেবার মান ও নাগরিক অংশগ্রহণ।

প্রাসঙ্গিক বাস্তবতা: যেকোন সিদ্ধান্ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেওয়া হয় কেন্দ্রিয়ভাবে, অথচ বাস্তবায়ন করতে হয় স্থানীয় পর্যায়ে। এতে সময় নষ্ট হয় , সুযোগ বাড়ে এবং স্থানীয় বাস্তবতা উপেক্ষিত হয়। স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অধীনস্থদের মতো আচরণ করেন, যেটি গণতান্ত্রিক শাসনের মৌলিক চেতনার মতো সাংঘাতিক। সুশাসনের আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নাগরিকদের অংশগ্রহণ স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা এই তিনটি স্তম্ভ কার্যকর না হলে যে কোন শাসন কাঠামো “কার্যকর শাসন” হিসেবে বিবেচিত হয় না।
তথ্য ও বর্তমান প্রেক্ষাপট: World Governance Indicator (WGI) ২০২৩ সালের রিপোর্ট বাংলাদেশের জন্য খুবই হতাশার ছিল। নিচে ৬ টি সূচকের প্রাপ্ত স্কোর দেওয়া হল।
Voice and Accountability: 26.6%
Political Stability: 16.0%
Government Effectiveness: 26.4%
Regulatory Quality: 16.4%
Rule of low :30.8%
Control of Corruption:16.8%
তাছাড়া Transparency International এর প্রকাশিত ২০২৩ সালের Corruption Perception Index (CPI) অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৮০ টি দেশের মধ্যে ফেয়ার স্কোর পেয়েছে মাত্র ২৪ এবং অবস্থান করছে ১৪৯ তম স্থানে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শুধুমাত্র আফগানিস্তান (২০) বাংলাদেশের নিচে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভুটান (৬৮) সবচেয়ে এগিয়ে (অবস্থান ২৬ তম) এবং দক্ষিণ এশিয়ার সেরা।
তাছাড়া ব্রাকের সাম্প্রতিক একটি গবেষণা অনুযায়ী গ্রামের ৫৯% মানুষ বলেছেন তারা কোন না কোন সরকারি সেবা পেতে গিয়ে ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন। ৩৫% মানুষ বলেছেন দালালের সাহায্য ছাড়া সরকারি অফিসে কাজ করানো খুবই কঠিন। উপরের তথ্য সমূহ বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার ঘাটতির এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। এই প্রবণতা শুধু দুর্নীতির সংস্কৃতি নয়, বরং প্রশাসনের ব্যর্থতা ও সুশাসনের ঘাটটির এক নির্মম বাস্তবতা।
সুশাসনের মৌলিক উপাদান: আন্তর্জাতিক মান ও দেশের বাস্তবতা: বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘ ও বিশ্ব ব্যাংক ৮ টি উপাদানকে কার্যকর সুশাসনের ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে । এই উপাদানসমূহ যে সমস্ত দেশে কার্যকর রয়েছে সে সমস্ত দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। চলুন সুশাসনের জন্য স্বীকৃত উপাদান গুলো জেনে নি‌ই।
নাগরিক অংশগ্রহণ: রাষ্ট্রের বিভিন্ন কার্যক্রম তথা বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের ও মতামত প্রতিফলনের সুযোগের ব্যবস্থা করা।
আইনের শাসন: সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা এবং আইনের সর্বজনীন প্রয়োগের ব্যবস্থা করা।
স্বচ্ছতা: রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তথ্য প্রবাহ উন্মুক্ত রাখা এবং স্বীয় কাজের জন্য রাষ্ট্রের জনগণের কাজে জবাবদিহি মূলক হওয়া।
জবাবদিহিতা: নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণের এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ।
সমতা ও অন্তর্ভুক্তি: রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, বিশেষ করে প্রান্তিক, সুবিধা বঞ্চিত এবং বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা।
দক্ষতা এবং কার্যকারিতা: দক্ষ ব্যক্তিবর্গের যথাপযোক্ত ব্যবহার এবং সম্পদ ও সময়ের সঠিক ও সময়োপযোগী ব্যবহার নিশ্চিত করা।
সম্মতিভিত্তিক শাসন: সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষদের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে বা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত কে বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন বিষয়ে নীতি নির্ধারণ করা।
দূরদর্শী নেতৃত্ব: সঠিক এবং ভবিষ্যৎমুখী পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য নির্ধারণ, যাতে করে চলমান বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলা যায়।
সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ সমূহ: বাংলাদেশের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমাদের দেশে এই ৮টি উপাদানের বেশিরভাগই আংশিকভাবে বিদ্যমান হলেও পরিপূর্ণভাবে কাজ করছে না। এতে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন কাঠামোগত ও বাস্তব সংকট।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ: আমাদের দেশে সবকিছুতে নগ্ন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ রয়েছে। যেটা সুশাসনের জন্য প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত। প্রশাসন, পুলি্‌ বিচার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে প্রতিটা রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ রয়েছে।
দুর্বল স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা: আমাদের দেশে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, জেলা – উপজেলা পরিষদ এবং সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্র থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়।
দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাব: ঘুষ, দালাল নির্ভরতা এগুলো নিত্য ঘটনা। তাছাড়া অনেকেই তথ্য গোপন করে থাকে। দুর্নীতি আজকাল সমাজের প্রতিটা স্তরে।
জবাবদিহিতার অভাব : প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কৃতকর্মের জন্য কারো ও নিকট জবাবদিহি করতে হয় না। ফলে এক রকমের অবাধ স্বাধীনতার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। RTI Act থাকলেও এর কার্যকারিতা নেই বললেও চলে এবং জনগণ RTI সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নন।
নাগরিক সচেতনতা এবং সুশিক্ষার ঘাটতি: আমাদের দেশে সমাজ ব্যবস্থায় নাগরিক সচেতনতার অভাব রয়েছে। তাছাড়া তথাকথিত শিক্ষিত হলেও সুশিক্ষার অভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হচ্ছে না।
E-Governence বাস্তবায়নে ধীরগতি: আমাদের দেশে E- Governance চালু হলেও সব ক্ষেত্রে এটা ব্যবহার হচ্ছে না। বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল সার্ভিস এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। তাছাড়া তরুণ ও নাগরিক সমাজের নীতি নির্ধারণের অনুপস্থিতি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একটা চ্যালেঞ্জ।
সুশাসন প্রতিষ্ঠায় করণীয় সমাধান: এবার চলুন আমাদের দেশে কি করলে কার্যকর ও জনমুখী সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে এ ব্যাপারে আলোচনা করা যাক।
১ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে স্বনির্ভর করতে হবে। কেন্দ্রের অযাজিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।
২- Right to Information Act আইন বাস্তবায়ন করতে হবে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে গণশুনানিকে বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৩- E- Governence ব্যবস্থাকে বিস্তর করে সরকারি সেবাকে সবার জন্য সহজ ও স্বচ্ছ করার ব্যবস্থা করতে হবে।
৪- দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে।
৫- বিভিন্ন ক্ষেত্রে তরুণদের অংশগ্রহণ এবং নীতি পর্যালোচনার জন্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে।
৬- সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি জাতীয় সূচক Governance Index চালু করা।
৭- বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ, বেসরকারি খাত এবং সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিদের নীতি নির্ধারণী কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা।

সুশাসন হল একটি রাষ্ট্রের প্রাণ যেখানে জনগণের অধিকার, ন্যায় বিচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে।
শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, নীতিগত ও প্রশাসনিক সংস্কার বাংলাদেশের জন্য সময়োপযোগী চ্যালেঞ্জ। শাসন কাঠামোকে নাগরিকমুখী ও সেবামূলক করতে না পারলে উন্নয়ন হবে বিভাজনের, সমতার হবেনা।

আবুল মনসুর হেলাল
রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট প্রফেশনাল
Email: mansur.mrf.bd@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *