দুপুর ২:৪৪ সোমবার ২৭শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘শিক্ষিত না হয়ে, আমরা সুশিক্ষিত হই’ : এ.এম. হেলাল

“শিক্ষিত না হয়ে, আমরা সুশিক্ষিত হ‌ই”

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সৃষ্টিকর্তার ইবাদতের জন্য‌ই মানুষ ও জীনদের সৃষ্টি করা হয়েছে। কালের বিবর্তনে মানুষ এখন সভ্যতার চরম উন্নতিতে পৌঁছেছে। যেখানে সবকিছু তথ্য প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পরিপূর্ণ হয়েছে । শিক্ষা, জ্ঞান – বিজ্ঞানের সুষম প্রয়োগের ফলেই মানুষ আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছে। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে বিশেষ পার্থক্য হল মানুষ চিন্তা করতে পারে, অন্য প্রাণীরা তা পারে না আর এই বিশেষ কাজটি আরো সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে পারে শিক্ষা অর্জন বা শিক্ষিত হওয়ার কারণে । যদি প্রশ্ন করা হয়” আপনি শিক্ষিত হবেন কেন ,উত্তরটা খুব সহজেই হতে পারে , যে নিজের অবস্থান উন্নয়নের জন্য। হ্যাঁ যদি খুবই সংক্ষিপ্ত এবং সহজবোধ্য ভাষায় বলা হয় তাহলে এটাই সবচেয়ে সুন্দর উত্তর।
শিক্ষিত হয়ে নিজের অবস্থার উন্নতির জন্য কোনটা করতে হবে আর কোনটা করা যাবে না এটা মনে হয় আধুনিক বিশ্বের উন্নত দেশ থেকে শুরু করে আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের মানুষরা জানেনা । তবে উন্নত দেশসমূহের শিক্ষার অপব্যবহার তুলনামূলক কম – তৃতীয় বিশ্ব তথা উন্নয়নশীল দেশ সমূহ বেশি। বলা হয়ে থাকে “Think Globally and Act Locally”. আর আমাদের মত দেশের মানুষরা এটাই ঠিক ভাবে করতে পারে না। প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার আজকাল বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে গেছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে এলিট শ্রেণী সবাই এর বেনিফিশিয়ারি ।
যেমনটা বলছিলাম মানুষের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তনের জন্য শিক্ষার প্রয়োজন বা মানুষকে শিক্ষিত হতে হয়। আর এই তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট অর্জন করে শুধুমাত্র শিক্ষিত হওয়া যায়, সুশিক্ষিত হওয়া যায় না। আপনি যদি শুধুমাত্র শিক্ষিত হন তাহলে যেমন নিজের অবস্থান পরিবর্তন সম্ভব, – অন্যের ক্ষতি করে। আপনি তখন সমাজের জন্য ক্ষতিকর। সারা ছাত্র জীবনে বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি যেসব সুবিধা ভোগ করে পুঁথিগত শিক্ষা জীবন শেষ করছেন সমাজ বা রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করার শপথে, সেখানে আপনি এই সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্যই ক্ষতিকর হয়ে যাচ্ছেন। অপরদিকে আপনি সুশিক্ষায় শিক্ষিত হলে আপনার নিজের অবস্থার পরিবর্তন তো হবেই পাশাপাশি সমাজ বা রাষ্ট্রের পরিবর্তনও অবশ্যম্ভাবী। আপনি তখন কারো জন্য ক্ষতিকর নয়। ছাত্রাবস্থায় যেমনটি পড়েছিলেন, “ছাত্ররাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ” আপনি ঠিক তেমন।
প্রশ্ন হচ্ছে আপনি কোথায় পাবেন শিক্ষা এবং সুশিক্ষা। এর উত্তর অনেক। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সকল দায়-দায়িত্ব নিতে বাধ্য। রাষ্ট্র নিজ প্রয়োজনেই নাগরিকদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবে। আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে রাষ্ট্র তো নাগরিকদের দায়িত্ব নেয় না! তাহলে কার দায়িত্ব সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার । এক্ষেত্রে সবচেয়ে যে এনটিটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে সেটা হল পরিবার। হ্যাঁ পরিবারই হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবার জন্য। পারিবারিক শিক্ষাই পারে ভবিষ্যতের সুশিক্ষায় নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এরপর যে বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সুশিক্ষিত হবার জন্য সেটা হল সামাজিক দর্শন ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা। কোন সমাজ ব্যবস্থা বা রাষ্ট্র যদি প্রকৃত অর্থে জ্ঞানী – গুণীজন দ্বারা পরিচালিত হয় বা রাষ্ট্রের দর্শনই যদি হয় নাগরিক উন্নয়ন তাহলে সেখানে সুশিক্ষিত জনসম্পদ তৈরি হওয়া খুবই সম্ভব। উন্নত বিশ্বের যে রাষ্ট্রগুলোতে ” Welfare State Theory” অনুযায়ী পরিচালিত হয় সেখানে শিক্ষিত এবং সুশিক্ষিত উভয়ের হার বেশি। আমাদের মত দেশসমূহে এই ব্যবস্থা খুবই করুন। যার দরুন পৃথিবী দ্রুত এগিয়ে চললে ও তারা তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না।

আমরা যদি আমেরিকা, ইউরোপ, রাশিয়া, জাপান,চীন প্রভূতি দেশের দিকে তাকাই, সেখানে দেখতে পাবো তারা পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিচ্ছে বিভিন্নভাবে। জ্ঞান – বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে একদিকে যেমন পৃথিবীর মানুষের জীবন ব্যবস্থাকে করেছে সহজ, বোধগম্য,গতিময় তেমনি আবার তারা অনেক শিক্ষিত হয়েও পৃথিবীকে বসবাসের অযোগ্য করে ফেলেছে। বিভিন্ন প্রাণঘাতী অস্ত্রের আবিষ্কার এবং এর যথেচ্ছা ব্যবহারে পৃথিবীর দুর্বল মানুষেরা আজ তাদের সহজ টার্গেটে পরিণত হয়েছে। তাদের দ্বারা মানবতা আজ পদদলিত। তারা নৈতিকতার বিসর্জন দিয়ে আধিপত্যবাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্র এবং জনগোষ্ঠী গুলোকে টার্গেট করে মরণ যুদ্ধ চালু রেখেছে। বিভিন্ন কূটচালে পুরো পৃথিবীকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। আর এইটাই প্রমাণ যে তারা সুশিক্ষা অর্জন করতে পারেনি। সুশিক্ষায় শিক্ষিত জাতি বা মানুষ কখনো অন্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে না। সুশিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তির কর্মের ফলাফল সারা পৃথিবীর সৃষ্টিকুল উপভোগ করতে পারে। পৃথিবীর উৎকর্ষে পশ্চিমা বা উন্নত দেশ সমূহের সুশিক্ষিত ব্যক্তিদের যেমন অবদান রয়েছে, তেমনি পৃথিবীর বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য ঐ সব দেশ সমূহের তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ বা দেশ‌ই দায়ী।

আমরা যদি এবার আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির প্রতি একবার দৃষ্টি দিলে দেখতে পাবো এইখানে ও এ দুয়ের বিস্তর ফারাক । স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে ও বাংলাদেশেই একমাত্র দেশ যা আজো ও কাঙ্খিত জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। এর অবশ্য বহু কারণ রয়েছে। যে কারণটা সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত সেটা হল আমাদের দেশের জনগণের সুশিক্ষার অভাব রয়েছে। আমরা শিক্ষিত হয়েছি বা শিক্ষিত হচ্ছি ঠিকই কিন্তু সুশিক্ষিত হতে পারেনি। যদি আমরা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারতাম তাহলে অপার সম্ভাবনার বাংলাদেশে আজকে এতো সমস্যা জিইয়ে থাকতো না।২০২২ সালের BBS এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে স্বাক্ষরতার হার ৭৪.৬৬%। পুরুষদের হার ৭৬.৫৬ এবং নারীদের ৭২.৮২%। দিন দিন এই হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সমাজ বা রাষ্ট্র এর সুবিধা পাচ্ছে না। সামাজিক উন্নতির সুচকে বাংলাদেশ দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে। আর সুশিক্ষিত না হওয়ার ফলশ্রুতিতে এর প্রভাব সমাজ জীবনের নিম্নস্তর থেকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছে। সীমাহীন দুর্নীতি, ঘুষ, খুন,হত্যা-ধর্ষণ,গুম , টেন্ডারবাজি, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি,রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, দলীয় লেজুড়বৃত্তি, রাজনৈতিক দূর্বূত্তায়ন, মানবিধাকার লঙ্ঘন, সিভিল সোসাইটি ও পেশাজীবীদের দলীয় সম্পৃক্ততা, সুশাসনের অভাব, গণতন্ত্র হত্যা, বাকস্বাধীনতা হরণ, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় এসব কিছু সুশিক্ষিত না হবার ফলাফল। প্রিয় বাংলাদেশে আমরা দেখেছি ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তিদের কত ধরনের অন্যায় কাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে । পরিবার প্রধান, সমাজ বা রাষ্ট্রপ্রধান বা এর পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ যদি সুশিক্ষায় শিক্ষিত না হন তাহলে কখনো সুষম উন্নয়ন সম্ভব না। শুধুমাত্র শিক্ষিত হলেই চলবে না বরং প্রয়োজন সুশিক্ষার। বাঙালি তথা বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে সুষম উন্নয়ন তথা ঠেকসই উন্নয়নের জন্য সুশিক্ষার বিকল্প নেই। আর এই সুশিক্ষার বুনিয়াদ হল পরিবার, সমাজ দর্শন এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা। সুশিক্ষার মাধ্যমেই বাংলাদেশের জনগণ তথা বাংলাদেশের কাঙ্খিত উন্নয়ন সম্ভব।

সুশিক্ষাই পারে বর্তমান অশান্ত পৃথিবীতে শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি করতে। সুশিক্ষাই পারে সকল ঘৃণা-হিংসা, অবিচার ,মতভেদ দূর করে পৃথিবীতে শান্তির ফোয়ারা সৃষ্টি করতে। তাই চলুন শিক্ষিত না হয়ে আমরা সবাই সুশিক্ষিত হই।

এ.এম.হেলাল
রিসার্চ এণ্ড ডেভেলপমেন্ট প্রফেশনাল।
মেইলঃ mansur.mrf.bd@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *