ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধঃ এবং মধ্যপ্রাচ্য
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক সমস্যার মধ্যে নতুন করে সৃষ্ট হওয়া সমস্যার নাম হলো ইরান ইসরায়েল যুদ্ধ। যেটা অবশ্যম্ভাবী ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পরেই নতুন করে সংঘঠিত হওয়া যুদ্ধ হলো ইরান - ইসরাইল যুদ্ধ।ক্ষমতা নেয়ার পূর্বে চলমান ছিল দুটি যুদ্ধ, রাশিয়া - ইউক্রেন যুদ্ধ, যেটা শুরু হয়েছিল ২৪ শে ফেব্রুয়ারি ২০২২ সালে যা এখনো চলমান। এ যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার (২০২২-২০২৪)। অপরদিকে ২০২৩ সালের অক্টোবরের ৭ তারিখে শুরু হয় ফিলিস্তিন(গাজা) - ইসরায়েল যুদ্ধ। এ যুদ্ধ এখনো চলমান। দখলদার ইসরায়েলী বাহিনীর হামলায় গাজা উপত্যকা আজ মৃত্যুপুরী। যেখানে মানবিক সংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিনিয়তই বেড়ে চলেছে মৃতের সংখ্যা। এ যুদ্ধে শিশু ও নারীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৫২০০০ হাজারের বেশি গাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আহতদের সংখ্যা ১,১০,০০০ এর বেশি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। এই যুদ্ধে গাজার নেতৃত্বদানকারী সংগঠন হামাস প্রধান সহ নিহত হয়েছেন অনেক উচ্চ পদস্থ কমান্ডার।
পাশাপাশি এ যুদ্ধে পরোক্ষভাবে জড়িয়েছে লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। ইজরায়েল লেবাননেও হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলের হামলায় লেবাননে হিজবুল্লাহর সদর দপ্তরে নিহত হয়েছেন হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ (২৭সেপ্টেম্বর ২০২৪)। এখন লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধ বিরতি চলছে। তাছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন বিষয়ে ঝামেলা চলছিল। পৃথিবীর শান্তিপ্রিয় মানুষ প্রত্যাশা করেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন। কিন্তু হল বিপরীত। ২২শে জুন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে আমেরিকান বাহিনী কথিত পরমাণু অস্ত্র ইস্যুতে ইরানের প্রধান তিনটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প “Fordow Fuel Enrichment plant, Natanz Nuclear Facility এবং Isfahan Nuclear Research Centre” এ B-2Spirit Stealth bombers বিমান দিয়ে হামলা করে যেখানে বাঙ্কার বিধ্বংসী বোমা ব্যবহার করা হয়। যেটা গোটা মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা পৃথিবীর জন্য অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেতানিয়াহুর পাশাপাশি ট্রাম্পের সরাসরি যুদ্ধে সম্পৃক্ত হওয়া তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আলামতই বটে। গত ১৩ জুন Operation Rising Lion নামে ইরানে আকস্মিক হামলা শুরু করে ইসরায়েল। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী গত জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি থেকেই ইরানে হামলার প্রস্তুতি শুরু করে ইসরায়েল।
চলুন ইতিহাস ঘুরে দেখে আসি ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব এবং জায়োনিস্টদের উৎপত্তি সম্পর্কে। কিভাবে এই ইহুদি দেশটির জন্ম হয়। ১৯৪৮ সালের আগে পৃথিবীতে ইসরায়েল নামক রাষ্ট্রের অস্তিত্বই ছিল না। ইহুদিবাদী এ রাষ্ট্রের জন্ম হয় ১৪ মে ১৯৪৮ সালের স্বাধীন সার্বভৌম ফিলিস্তিনে।২য় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি গণহত্যার(Holocaust) পরে বিশ্ব ইহুদিদের জন্য একটি 'নিরাপদ রাষ্ট্র' গঠনের দাবি জোরদার হয়। ব্রিটিশ শাসিত প্যালেস্টাইন এলাকায় জাতিসংঘের পরিকল্পনায় ইহুদি ও আরব দুটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব আসে( ১৯৪৭ সালের UN Partition Plan থেকে)। তার ও আগে উনিশ শতকের শেষের দিকে ইহুদি জনগণের জন্য একটি 'স্বাধীন নিরাপদ রাষ্ট্র' প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু হয়। ঐ আন্দোলনের দাবি অনুযায়ী ফিলিস্তিনেই হবে ইহুদী রাষ্ট্র কারণ ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনই ইহুদিদের জন্মভূমি।স্বতন্ত্র এবং আলাদা ইহুদি রাষ্ট্রের প্রবর্তক বা স্বপ্নদ্রষ্টা বলা হয় থিওডের হার্জেলকে। ১৮৯৬ সালে জায়োনিজম এবং ইহুদি রাষ্ট্রের উপর 'The Jewish State' নামে একটি বই লেখেন। তাছাড়া ১৯১৭ সালের ব্যালফোর ঘোষণা( Balfour Declaration) এর মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার ইহুদীদের জন্য ফিলিস্তিনে বাসস্থান প্রতিষ্ঠার পক্ষে সমর্থন জানায়। তাছাড়া মুসলিম ইতিহাস অনুযায়ী অটোমান বা ওসমানীয় সাম্রাজ্যের সর্বশেষ স্বাধীন সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ খান ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে ব্রিটিশ এবং ইহুদিরা মিলে সুলতানের নিকট এই মর্মে প্রস্তাব নিয়ে যায় যে সুলতান আঃ হামিদ যদি জেরুজালেম ইহুদিদেরকে দিয়ে দেন আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য, বিনিময়ে সুলতান কে তারা আজীবন ক্ষমতায় থাকার নিশ্চয়তা ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পুরানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা, এবং প্রচুর ধন সম্পদের প্রস্তাব দেয়া হয়। খোদাভীরু সুলতান তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। ঘটনাটি ১৯ শতকের শুরুর দিকে। সুলতান থেকে বিতাড়িত হয়ে ইহুদিরা ব্রিটিশ ও পশ্চিমাদের সহায়তায় আশ্রয় পাওয়া ফিলিস্তিনে জোর করে অবৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে।
এবার মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিধর দেশ ইরান সম্পর্কে একটু জেনে নেয়া যাক। বিচিত্র প্রাকৃতিক গঠনে ইরান বরাবরই পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে ব্যতিক্রম। দেশটাকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সাম্রাজ্য শাসন করেছে।সারা দুনিয়ার বাদশা জুলকারনাইন 'Cyrus the Great' ইরানকেন্দ্রিক আচমেনিদ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন খ্রিস্টপূর্বে। তাছাড়া পার্শিয়ান সাম্রাজ্য, সাসালিয়ান সাম্রাজ্য, খোলাফায়ে রাশেদীন, উমাইয়া এবং আব্বাসীয়, বুঈয়ি,সেলজুক সালতানাত, ইলখানি সাম্রাজ্য, তৈমুরি সম্রাজ্য, সাফাভি সাম্রাজ্য, কাজার ও পাহলভি শাসন দ্বারা ইরান শাসিত হয় বিভিন্ন সময়ে।১৯৭৯ সালে ইসলামিক গণআন্দোলনে পাহলভি শেষ শাসক মোহাম্মদ শাহ পাহলভি ক্ ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যান এবং বর্তমান শাসকগোষ্ঠী ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। সর্বপ্রথম ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী এবং তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে ক্ষমতায় আসেন বর্তমান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
বলছিলাম গত ১৩ জুন ইরানে Operation Rising Lion নামে হামলা শুরু করে ইজরায়েলরা। এর তিন দিন পর ইরান ইজরায়েলে পাল্টা আক্রমণ করে Operation Trur Promise Three নামে। ইজরায়েলী হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরান। ইরান হারিয়েছে তাদের Islamic Revolution Guard Crops এর চীফ, Chief of Army Staff, Al-Kudos Chief, Chief Intelligence বিশিষ্ট Nuclear Scientist সহ সামরিক - বেসামরিক অনেক ব্যক্তি এবং পারমাণবিক ও বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা। অপরদিকে ইসরাইলের বেশ কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উদ্বেগের যে বিষয় সেটা হলো ইতিমধ্যেই আমেরিকায় এ যুদ্ধে জড়িয়েছে। পরমাণু স্থাপনায় হামলা করেছে। ইরান প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছে। ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধ হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলো। ইরান যদি সত্যি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তাহলে পৃথিবীর অর্থনীতির জন্য এটা অনেক বিপর্যয়ের কারণ হবে।
একযোগে ইসরাইল এবং আমেরিকা ইরানে হামলা করলে ইরান কি ভাবে সামাল দিবে? নিষেধাজ্ঞায় ভুগতে থাকা দেশটি কতদিন যুদ্ধ চালিয়ে নিতে পারবে এটা চিন্তার বিষয়। অপরদিকে প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলো শুধুমাত্র বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছে যেটা আরো উদ্বেগের। OIC একেবারেই নিষ্ফল। এটার কোন কার্যক্রম দৃশ্যমান না। তাছাড়া ইরানের মিত্র দেশগুলো রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া তাদের পদক্ষেপ সুস্পষ্ট নয়। আদৌ কি তারা মিত্র ইরানের হয়ে লড়বে- মনে হয় না। রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক বক্তব্যে তেমন কোন আলামত নেই। ইরানের স্ট্যাটেজিক অংশীদার হিজবুল্লাহ, হুতি ও হামাস কাউকেই পাশে দেখা যাচ্ছে না। তাহলে কি ইরান বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে? আমার মতে অনেকটাই।
যে ইস্যুতে ইজরায়েল ইরানকে সবসময় আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করত সেটা হলো পরমাণু। বলা হয়ে থাকে ইরান পরমাণু অস্ত্রধর দেশ হয়ে উঠছে। যার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্ররা ইরানের উপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে।২০০৩ সালে এক ফতোয়ার মাধ্যমে আলি খামেনি পরমাণু অস্ত্র উৎপাদন হারাম বলে ঘোষণা করেছেন। ইরান বরাবরই বলেছে তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। শুধুমাত্র ইউরেনিয়াম উৎপাদনের জন্য। NPT বা Non Proliferation Treaty অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র,রাশিয়া যুক্তরাজ্য ফ্রান্স এবং চীন পরমাণু শক্তিধর দেশ। NPT বহির্ভূত পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো হলো ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল এবং উত্তর কোরিয়া। এখানে ইরানের নাম নেই। তাহলে পরমাণু ইস্যুতে ইজরায়েল এবং আমেরিকা ইরানে হামলা করল কেন? এর উত্তর অনেক এবং সহজ উত্তর আছে কয়েকটা।
যেমনটা বলেছিলাম ইরান কি বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে? কোন মুসলিম রাষ্ট্র কি ইরানের পাশে দাঁড়াবে? কোন মিত্র রাষ্ট্র কি ইরানের পাশে দাঁড়াবে? কোন স্ট্র্যাটেজিক অংশীদার কি ইরানের পাশে দাঁড়াবে? অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে না। একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিশালী দেশ পাকিস্তানের সাথে ইরানের সীমান্ত রয়েছে।দেশটিতে শিয়া - সুন্নি দ্বন্দ্ব, জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান, বেলুচিস্থান ইস্যু সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক অর্থনৈতিক স্থবিরতা রয়েছে। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের সাথে ইরানের সম্পর্ক ভালো থাকলেও আমেরিকার মতো পাশে থেকে যুদ্ধে থাকার সম্ভাবনা নেই। ইতিহাসের চীন কখনো কারো পাশে দাঁড়ায়নি। রাশিয়া যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত। তাছাড়া ইসরাইলে বহু রাশিয়ান বাস করে এমতাবস্থায় রাশিয়ার পাশে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ। উত্তর কোরিয়ার তো প্রশ্নই আসেনা। আরব মুসলিম রাষ্ট্রগুলো তো অনেক আগেই পশ্চিমা এবং ইসরাইলের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। গাজা ইস্যুতে তাদের নীরবতা পশুত্বকেও হার মানিয়েছে। মুসলিম বিশ্বের আলোচিত নেতা রিসেফ তাইয়েফ এরদোয়ান। যার থেকে মুসলিম বিশ্বের প্রত্যাশা অনেক বেশি। অথচ গাজা ইস্যুতে তিনি ফেল করেছেন। কিছুদিন আগে তার দেশে নজিরবিহীন বিক্ষোভ হয়েছে। আপাতত সামাল দিলেও পশ্চিমা এবং ইসরাইলের বিপক্ষে কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাহলে কে আসবে ইরানের হয়ে লড়তে? হামাস তো প্রায় শেষ বলা চলে। ইয়ামেনের হুতি বিদ্রোহীদের দ্বারা অনেক কিছু করা সম্ভব নয়। হিজবুল্লাহ প্রধানের মৃত্যুর সময় ইরানের নীরব থাকাকে মেনে নিতে পারেনি হিজবুল্লাহ। তাছাড়া বর্তমানে লেবাননে পশ্চিমা মদদপুষ্ট পুতুল সরকার রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী হিজবুল্লাহ অস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার করতে পারবে না। এমতাবস্থায় মনে হচ্ছে ইরান সত্যিই একা। জাতিসংঘের আণবিক সংস্থা ও বলেছে ইরানে পারমানবিক অস্ত্র নেই। সম্ভাব্য মজুত ইউরেনিয়ামের পরিমাণ ৪৬০ কেজির মতো তাহলে ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করলো কেন?
অবস্থা দৃষ্টে এটা প্রতীয়মান যে এই মুহূর্তে ইরান একা এবং একাই লড়বে। আদৌ কি ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে? সেটা তর্ক-সাপক্ষে হতে পারে। তবে ইরানের কাছে পরমাণু অস্ত্র থাকলেও যুদ্ধে না ব্যবহারের সম্ভাবনাই বেশি। এক্ষেত্রে কূটনৈতিক সমাধানই হতে পারে যুদ্ধ বিরতির মাধ্যম। প্রকাশ্য ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা কে ট্রাম্প কর্তৃক প্রত্যার হুমকি আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অগ্রহণযোগ্য। তাছাড়া আমেরিকার প্রেসিডেন্টের হুমকির প্রেক্ষিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রজ্ঞাময় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ সর্বজনের প্রশংসা কুড়িয়েছে এবং ইরানের জনগণ স্বাগত জানিয়েছে। আমেরিকা বা ইসরায়েল যদি খামেনিকে হত্যার পরিকল্পনা করে সেটা গোটা মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা পৃথিবীকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। আশা করি যুদ্ধবাজ ইজরায়েল -আমেরিকা এ পথে হাঁটবে না।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা, নিজেদের নিরাপত্তা এবং পরমাণু ইস্যুতে ইজরায়েল ইরানে হামলা চালায় যেটা আমেরিকার প্রত্যক্ষ মদদে এবং এখন আমেরিকা ইজরায়েলের এ যুদ্ধের সহযোগী। শুধুই কি ইজরায়েল তার দেশের নিরাপত্তার কথা ভেবে ইরানে হামলা চালিয়েছে? মোটেই না। এটা এক সূদুরপ্রসারী চিন্তার ফল। ইরানের ভিতরে ইজরায়েলের অনেক গুপ্তচর রয়েছে। যার দরুণ ইজরায়েল এতো নিখুঁতভাবে লক্ষ্যে আঘাত করতে পেরেছে। ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদনিজাদ প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে সেনাবাহিনীর শীর্ষকর্তাদের দিয়ে তিনি একটি ইজরায়েল বিরোধী ফোর্স গঠন করতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন খোদ সেনাবাহিনীতে ইজরায়েলের গুপ্তচর রয়েছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইরানের বিপ্লবী গার্ড প্রধান কাসেম সুলাইমানিকে ইরাকে হত্যা করা হয়। ইরানের গোয়েন্দা দুর্বলতা আরো প্রকাশ পায় নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেকসিয়ানের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়া হামাস প্রধান ইসমাঈল হানিয়ার মৃত্যু সুরক্ষিত সেনা নিয়ন্ত্রিত হোটেলে। যার দায় ইসরায়েল স্বীকার করে।
যেমনটা বলেছিলাম, শুধুমাত্র আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে ইরানে হামলা করা হয়নি। যদি আমরা একটু পিছনে ফিরে তাকাই তথাকথিত আরব বসন্ত শুরু হয়েছিল তিউনিয়ার প্রেসিডেন্ট যাইনূল আবেদীন বিন আলীর পতনের মাধ্যমে । পর্যায়ক্রমে মিশরের হুসনি মোবারক, লিবিয়ার গাদ্দাফির মতো সিংহপুরুষের পতন ঘটে৷ এক যুগের বেশি সময় ধরে চলা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের অবসান হয় বাসার আল আসাদের পতনের মাধ্যমে। এগুলো সবকিছু সুচিন্তিত এবং পরিকল্পিত। এর আগে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে অপসারণ করা হয় মধ্যপ্রাচ্যের আরেক সিংহ পুরুষ ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে। যে পরমাণু অস্ত্রের অপবাদ দিয়ে ইঙ্গ-মার্কিন হামলা করা হয় তারাই শেষমেষ স্বীকার করে সাদ্দাম প্রশাসন কোনো মরণাস্ত্র উৎপাদন করেনি। লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফি পশ্চিমাদের মিত্র হলেও শেষ পর্যায়ে বুঝতে পেরেছিলেন পশ্চিমারাই আসল শত্রু। তিনি চুক্তি করে পরমাণু কর্মসূচি থেকে ফেরত এসে ছিলেন, আর এটাই তাঁর পতনের কারণ হয়েছিলো। অথচ যুদ্ধবাজ ইজরায়েল ফ্রান্সের সহযোগিতায় ১৯৫৫ সালে পরমাণু কর্মসূচি চালু করে এবং তাদের পরমাণু অস্ত্র আছে।এরো ও আগে পশ্চিমা এবং ইজরায়েলি ষড়যন্ত্রে ক্ষমতাচ্যুত হন মিশরের জাতীয়তাবাদী নেতা প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দুল নাসের। আসাদ সরকারের পতন হয়েছে অল্প কিছুদিন আগে। আসাদ সরকারের সাথে ইরানের সুসম্পর্ক ছিল। আমরা যদি একটু অন্তর্দৃষ্টি দেই তাহলে বিষয়টা আরো পরিষ্কার হবে।
মধ্যপ্রাচ্য তথা মুসলিম বিশ্বে কোন সম্ভাবনাময় নেতাকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেয়নি এবং দিচ্ছে না পশ্চিমা এবং ইহুদীরা। শিয়া -সুন্নি দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিক বিভিন্ন সমস্যা জিইয়ে রেখেছে পশ্চিমারা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের উত্থান তথা সামরিক এবং পরমাণু অস্ত্রে ইরান শক্তিশালী হোক এটা সৌদি আরবসহ অনেক আরব দেশগুলো চায়না। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের একক কর্তৃত্বে নাখোশ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলো। তাছাড়া শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠতাও একটি ফ্যাক্টর সুন্নি দেশগুলোর নিকট। আমেরিকা ইচ্ছা করেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চালু রেখেছে আর হাজার কোটি ডলারের অস্ত্রের ব্যবসা করছে। প্রতিটা মধ্যপ্রাচ্যের দেশে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। আমেরিকা এবং ইজ রাইলের প্লান হল প্রতিবাদী এবং সম্ভাবনাময় সরকার গুলোকে হটিয়ে পুতুল সরকার বসানো। এটা তারা দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করে আসছে। এই পরিকল্পনার সর্বশেষ ধাপ হলো ইরান। খামেনি সরকারের পতন ঘটাতে পারলেই পুরো মধ্যপ্রাচ্য ইহুদি এবং পশ্চিমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। ইজরাইল সিরিয়া এবং জর্ডানের আকাশ পথ ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালিয়েছে।সিরিয়ার অন্তবর্তী প্রেসিডেন্ট আলশারা সামান্য একটি জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রধান হয়ে আমেরিকা এবং ইসরাইলের সহযোগিতায় আসাদ সরকারের পতন ঘটায়। যেটা খুবই পরিকল্পনা মাফিক। ইজরায়েল ও পশ্চিমাদের মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র বাধা খামেনী ও ইরান। খামেনীর সরকারের পতন ঘটাতে পারলেই ইসরাইল গ্রেটার ইসরাইল প্রতিষ্ঠায় আরো এগিয়ে যাবে। তাদের বিশ্বাস মতে মাসিহ আসবে এবং জেরুজালেম থেকে মাসিহ সারা পৃথিবী শাসন করবে আর, পশ্চিমারা মধ্যপ্রাচ্যের সম্পদ লুটে খাবে।
কূটনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে যদি এই সংঘাত বন্ধ না হয় তাহলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য তার জৌলুস হারাবে। পিকে হিট্টি বলেছিলেন, 'আরবীয়রা WWW এ গভীর আসক্ত, মানে হলো Wine, War & Women মদ, নারী এবং যুদ্ধ। বর্তমানে তারা যুদ্ধে আসক্ত না হলেও মদ, এবং নারীতে আসক্ত। বর্তমানের আরব নেতারা তাদের স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়েছে পশ্চিমাদের কাছে। নিজেদের ভাইয়েরা মারা যাচ্ছে আর তারা বিলাসিতায় মত্ত। সৌদির ডিফ্যাক্টো শাসক সালমান ইতিমধ্যে পশ্চিমাদের কাছে বিক্রি হয়ে গেছেন। কাতারের আমির,জর্ডানের বাদশা, আমিরাতের আমির এরা সবাই পশ্চিমা এবং ইহুদীদের সহযোগী। নিজেদের স্বৈরাচারী শাসন এবং ক্ষমতা বাঁচানোর জন্য আতাঁত করেছে। কাতার পৃথিবীর বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হয়েও গাজা ইস্যুতে কিছুই করেনি। অবাক হবো না ইরানে খামেনি সরকারের পতন হলে। পৃথিবী আবারও স্বাক্ষী হবে বিশ্বাস ঘাতকতার। কোনো প্রতিবেশী তথা মুসলিম দেশ ইরানের পাশে দাঁড়ায়নি।
যুদ্ধ কখনো শান্তি বয়ে আনে না।এর আগে পৃথিবী ২টা বিশ্বযুদ্ধ দেখেছে। প্রযুক্তির স্বর্ণ সময়ে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে পৃথিবীকে বিষাক্ত করা থেকে বিরত থাকতে হবে। গাজার শিশুদের কান্না আজও শেষ হয়নি। শক্তিশালী দেশসমূহকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এ যুদ্ধ বন্ধের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোকে ক্ষুদ্র স্বার্থ ভুলে মুসলিম উম্মার স্বার্থে এক হতে হবে। ইমাম মাহাদির অপেক্ষা না করে ন্যাটোর ন্যায় মুসলিম দেশগুলোর আলাদা সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে হবে। নবী - পয়গম্বরের স্মৃতিময় মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের মুসলিমদের কাছে গৌরবের।এ গৌরব হারাতে দেয়া যাবে না। ইহুদিদের টার্গেট কেন শুধু মুসলমানরা এ প্রশ্নের উত্তর বের করে কাজ করতে হবে। জেগে উঠুক মানবতা, প্রাণ ফিরুক গাজায়, যুদ্ধ বন্ধ হোক রাশিয়া - ইউক্রেন সহ চলমান পৃথিবীর সকল প্রান্তের। আগামীর পৃথিবী হোক মানবতাময়। দেশ হোক সীমানাবিহীন। আগামীর পৃথিবী হোক শিশুর জন্য বাসযোগ্য- যুদ্ধহীন।
এ. এম. হেলাল
রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট প্রফেশনাল
প্রকাশক ও সম্পাদক | মনিরুল ইসলাম রাজিব | মোবাইল: 01923355655
নির্বাহী সম্পাদক | মোঃ তামিম খান | মোবাইল: 01826668486
Copyright © www.apnarsongbad.com